যানজট আজকের পৃথিবীর অনেক বড় একটি সমস্যা। কোনো দেশে বেশি, আবার কোনো দেশে তুলনামূলকভাবে কম হলেও যানজট সমস্যাটি ধীরে ধীরে গ্রাস করছে পৃথিবীর প্রায় সব দেশকে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে এর ব্যাপকতা মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে অনেক বেশি। বাংলাদেশের এয়ারপোর্ট থেকে কতটুকু সময়ে আপনি ধানমন্ডি যেতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করে বলার উপায় নেই। এর মূল কারণ ঐ যানজট। ঘুরে আসুন না কলকাতা শহর, সেখানেও দেখবেন যানজট সমস্যা। নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, লন্ডন কোথায় নেই এ যানজট! ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটের ভিড়ে নাজেহাল আজকের দিনের হংকং শহর। পাতাল ট্রেন, উড়াল ট্রেন—এসব দিয়েও রক্ষা পায়নি তারা। ভবন থেকে ভবনে গড়ে তুলেছে তারা পদব্রজের সেতু। গাড়ি নিয়ে বেরোলে যানজটের কবলে পড়তে হবে বলে সেখানে হাঁটছে হাজার হাজার মানুষ। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মিয়ানমার কোনো প্রতিবেশীই আর এ যানজটের হাত থেকে মুক্ত নেই বর্তমান সময়ে।
যানজট এড়ানোর লক্ষ্য ও পরিকল্পনা করে যাচ্ছে একদল বিজ্ঞানী পৃথিবীর কোণে কোণে। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী পরিকল্পনা করে যাচ্ছে দেশগুলো। জাপান, স্লোভাকিয়া, রাশিয়া—যে যার নিজের মতো করে বিদ্যুত্-চালিত উড়ন্ত গাড়ি তৈরির ম্যারাথনে অনেকটাই এগিয়ে আছে। তারা মূলত শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। গাড়ি তো উড়ে চলবে ঠিক যেমনটা আমরা কাল্পনিক সিনেমাগুলোতে দেখেছি। এবার প্রশ্ন হলো, গাড়ি তো চলবে আকাশে—কিন্তু উড়বে কোথা থেকে, নামবে কোথায় গিয়ে? নিজের বাড়ির ছাদ থেকে কি উড়ন্ত গাড়ির মালিক পাড়ি দেবে আকাশে? আবার কি ফেরার পথে তার ছাদেই ল্যান্ড করবে? এবার ব্রিটেন তার উত্তর দিল—তারা তৈরি। এ বছরের নভেম্বরেই ব্রিটেনের আমজনতা দেখবে কভেন্ট্রি শহরে উড়ন্ত গাড়ির এয়ারপোর্ট। এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট বিমানবন্দর। কিন্তু বিমান নয়, এখানে শুধুই ওঠানামা করবে ফ্লাইং কার অর্থাত্ উড়ন্ত গাড়ি। ব্রিটেনের কোম্পানি ‘আরবান এয়ারপোর্ট’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘হুন্দাই মোটর’ এ বিমানবন্দরটি যৌথভাবে তৈরি করছে। এ প্রকল্পে ব্রিটেন সরকারের ১২ লাখ পাউন্ডের সরকারি অনুদানও জুটেছে। পৃথিবীতে ফ্লাইং কারের জন্য তৈরি প্রথম এয়ারপোর্টটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘এয়ারওয়ান’। যাত্রীবাহী ড্রোন কিংবা পণ্যবাহী ছোট গাড়ি এয়ারওয়ান থেকে উড়ে যেতে পারবে এবং ল্যান্ড করতে পারবে। এটি হবে একটি পপ-আপ জাতীয় গাড়িবন্দর, যাতে থাকবে ছোট রানওয়ে আর ১৪ মিটার ব্যাসার্ধের ল্যান্ডিং প্যাড। গাড়ি আকাশ থেকে নেমে প্যাড স্পর্শ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা ঢুকে যাবে বন্দরের অন্দরে। কভেন্ট্রি শহরের প্রাণকেন্দ্র রিকো এরিনা স্টেডিয়াম লাগোয়া একটি পার্কিং বদলে এটি তৈরি করা হচ্ছে।
একটা সময় পর্যন্ত ফ্লাইং কার শুধু কল্পবিজ্ঞানের এবং সিনেমার অংশই ছিল। কিন্তু গত বছর নিজেদের তৈরি উড়ন্ত যানে এক যাত্রীকে নিয়ে সফল পরীক্ষা করল জাপানের কোম্পানি ‘স্কাইড্রাইভ ইনকরপোরেশন’। তারা ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৩ সালের মধ্যেই তারা বাণিজ্যিকভাবে এ গাড়ি বাজারে আনতে সক্ষম হবে। স্লোভাকিয়ার একটি সংস্থাও গত ৩০ বছরের পরিশ্রমে এমন একটি ফ্লাইং কার তৈরি করেছে, যা চোখের পলকে বদলে যাবে বিমানে।
যানজট নিরসনে সৌদি আরবের আছে ভিন্ন চিন্তা। কোনো গাড়ি থাকবে না, রাস্তা থাকবে না, স্বাভাবিকভাবেই কোনো দূষণও থাকবে না। এমন একটি শহর তৈরি করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। তারা এ শহরের নাম দিয়েছে ‘দ্য লাইন’। প্রকল্পের নাম নিওম প্রকল্প। সৌদির রাজধানী শহর তাবুকে লোহিতসাগরের তীরে গড়ে উঠবে এ শহরটি। ১০ হাজার বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃৃত হবে নিওম প্রকল্প। তার মধ্যে তৈরি হওয়া ‘দ্য লাইন’ শহরটির বিস্তৃৃতি হবে লম্বায় ১৭০ কিলোমিটার। এভাবেই শহরের নকশাটি করা হয়েছে, যাতে শহুরে জীবনের যাবতীয় সুবিধা একেবারে হাতের কাছে চলে আসে। কোনো কিছুর জন্য গাড়িতে ওঠার প্রয়োজন পড়বে না; স্কুল, হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, কফিশপ, বইয়ের দোকান থেকে অফিস, বাড়ি সর্বত্রই হাঁটাপথে ১০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হবে।
আমাদের বাস করা পৃথিবী যে কোথায় এগিয়ে যাচ্ছে তা ভাবতেই কেমন শিহরন জাগে! বিজ্ঞান তাকে নিয়ে যাচ্ছে কল্পনার রাজ্য জয় করাতে। আবার কেউ ফিরে যাচ্ছে প্রাকৃতিক দূষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থায়। গতকাল যা ছিল কল্পনাবিলাসীদের স্বপ্নের সম্পদ, তা-ই যেন রূপ নিচ্ছে বাস্তবতার কঠিন বিশ্বাসের আগামীকাল। আমাদের কাছের দেশ সিঙ্গাপুর। সেখানকার বিজ্ঞানীরা বায়ু থেকে পানীয় জল তৈরির ফর্মূলার কথা জানিয়েছেন ইতিমধ্যে। অধ্যাপক হো ঘিম উইয়ের নেতৃত্বাধীন গবেষক দল জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া মানদণ্ডের মধ্যেই তারা বায়ু থেকে পানি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
মানুষের বিনোদনের জন্য একসময় টেলিভিশন আবিষ্কার হলে মনে হয়েছিল, এটাই বুঝি সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। আজ যানজট নিরসনে আবিষ্কার হতে চলেছে ফ্লাইং কার অর্থাত্ উড়ন্ত গাড়ি। মানুষের আবিষ্কারের পথে আছে চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহ। সৌদি আরবের মতো দেশও আজ দূষণমুক্ত শহর তৈরিতে সক্ষম। কোথায় গিয়ে শেষ হবে মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিধি? বিজ্ঞানের প্রতি, মানুষের সাধ্যের প্রতি আমাদের স্বপ্নের সীমা অতিক্রমের হাতছানি নিয়ে আগামী দিনের পৃথিবী যেন আমাদের আহ্বান করছে।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা