বস্তির জীবনে ফিরে আসুক স্বস্তি

খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা চিকিত্সা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা হিসেবে চিহ্নিত। ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য সব নাগরিকের প্রয়োজন এই মৌলিক উপাদানগুলো। কিন্তু দেশের সব নাগরিক সমানভাবে পাচ্ছে না এই সুযোগ। বিশেষ করে দেশের বস্তিগুলোতে রয়েছে মৌলিক চাহিদা পূরণের অপ্রতুলতা।

একই ঘরে গাদাগাদি করে অনেক লোকের বাস, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিরাপদ পানীয় ও খাদ্যের অভাব, শিক্ষা-চিকিত্সার বালাইহীনতা, নানা রকম রোগব্যাধি নিত্যসঙ্গীসহ নানান সমস্যায় জর্জরিত আমাদের দেশের বস্তিগুলো। ক্ষুদার জ্বালায় আর্তনাদ, চিকিত্সার অভাবে সজ্জাশায়ী, শিক্ষার অভাবে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সচেতনতার অভাবে নানা ধরনের অপরাধকাজে লিপ্ততা—এ বিষয়গুলোই দেশের প্রতিটি বস্তির বাস্তব চিত্র। প্রতি বছর নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে ভিটেমাটিহারা হয়ে নতুনভাবে বাঁচতে বহু লোক পাড়ি জমায় রাজধানী শহর ঢাকায়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে কোনোভাবে বেঁচে থেকে জীবন ধারণ করা। গ্রাম বা মফস্সল থেকে আগত এসব মানুষের আবাসস্থল হয় ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তিতে। বস্তিগুলোতে সাধারণত বসবাস করে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ। ছোট দোকানি, গৃহকর্মী, রিকশাচালক, পরিবহনশ্রমিক, পোশাকশ্রমিকসহ শ্রমজীবীদের বাস বস্তিগুলোতে। দেশে বসবাসরত জনসংখ্যার বিভিন্ন সমস্যা জনপ্রতিনিধি পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো না কোনো সময় সমাধান হয়। কিন্তু আমাদের দেশের বসবাস করা বস্তিবাসীর জীবনপট বহু বছর ধরে একই। নেই কোনো পরিবর্তন। ভগ্ন দুর্দশায় কাটে তাদের জীবন। কোনো প্রকার নাগরিক সুবিধা, আধুনিকতার ছোঁয়া পায় না বস্তিবাসী। অস্তিত্বের সংকটে কাটে তাদের জীবন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে উচ্ছেদ অভিযান বস্তিবাসীদের জীবনে তৈরি করে নতুন দুর্ভোগ।

এর ওপর বর্তমান সময়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। বহু কষ্টে যাপন করা বস্তিবাসীর জীবনে এমনিতেই দুর্ভোগের অন্ত নেই, এর মাঝে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় দৈনিকগুলোর তথ্যমতে, দেশে গত বছরের শুরু থেকে ১১ মাসে মোট ৩০ বার রাজধানীর বস্তিগুলোতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় নিঃস্ব হয়ে যায় বস্তির বাসিন্দারা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের জীবন রক্ষা করতেই হিমশিম খেতে হয় তাদের, জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্য কিছু রক্ষা করা তো দুরূহ। অনেক সময় তো ভয়াবহ এই আগুনে প্রাণ যায় অনেকের।

বর্তমান সময়ে কেন বেশি হচ্ছে এ ধরনের ঘটনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে মিলেছে ভিন্ন ভিন্ন মত। বস্তির বাসিন্দাদের একাংশ বলছে, অতিরিক্ত ঘনবসতির কারণে ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট বা মশার কয়েল থেকে ঘটছে এমন ঘটনা। আবার কেউ বলছে, পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয় এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড। নির্মম এই অপরাধের পেছনে যে কারণই দায়ী হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট প্রসাশনকে খুঁজে বের করতে হবে এর কারণ। এর সঙ্গে জড়িতদের আনতে হবে আইনের আওতায়।

সংবিধান যেখানে দেশের সব নাগরিকের সমান সুযোগ-সুবিধার কথা বলে, সেখানে সমাজের অন্যান্য নাগরিকের চেয়ে নিগৃহীত আমাদের দেশের বস্তিতে বসবাসরত নাগরিকেরা। সব ধরনের সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। তার ওপর এ ধরনের ঘটনা যেন আরো বেশি আশাহত করে তোলে তাদের। সমাজের বাকি সদস্যদের চেয়ে এমনিতেই কয়েক গুণ নিম্নভাবে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। এর ওপর নতুন সৃষ্ট সমস্যাগুলো যেন তাদের জীবনে নতুন বাঁধার আগমন ঘটায়। কিন্তু একটি দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের এ ধরনের জীবনযাপন কখনোই কাম্য নয়। তাদেরও অধিকার আছে মৌলিক চাহিদা পূরণের। আমাদের দেশের বস্তিগুলোতে বসবাস করা এত বিশাল জনগোষ্ঠীর নিরাপদ জীবন দান করা সরকারের একার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। বস্তির জীবন স্বস্তিময় করতে এগিয়ে আসতে হবে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে। সহায়তার হাত বাড়াতে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে। তবেই তারা ফিরে পাবে নাগরিক অধিকারসমূহ এবং বাঁচতে পারবে সমাজের বাকি ১০ জনের মতো নাগরিক অধিকার নিয়ে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়