স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে এবার মার্চ মাসটি বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একই সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে এবং সেহেতু বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় জীবনেও মার্চ মাসটির গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯২০ সালে মার্চ মাসের ১৭ তারিখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন। ৫১ বছর বয়সে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ বাঙালির উপস্থিতিতে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ‘মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’-এর ডাক দেন। একই মাসের ২৬ তারিখে দেন স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, যে কারণে তারিখটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে স্বীকৃত।
এমনিতেই বছরের বারোটি মাসের প্রতিটিরই আলাদা আলাদা গুরুত্ব এবং তাত্পর্য আছে। কিন্তু ইংরেজি ক্যালেন্ডারের মার্চ মাসটি আমাদের জাতীয় জীবনের বিশেষ গুরুত্ব ও তাত্পর্যবহ এবং ঐতিহাসিক একটি মাস। সত্যি বলতে কি, এই মার্চ মাসটি আমাদের জাতীয় জীবনে সব সময়েই যেন সংগ্রাম ও মুক্তির বারতা নিয়েই আবির্ভূত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ঊপনিবেশিক শাসনাধীন ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হলে বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে শুরু হয় আমাদের সংগ্রাম। এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন তথা স্বাধীনতার আন্দোলন, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালিরা তাদের মাতৃভূমিকে পাকিস্তানি নবঊপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত করে এবং এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পুরোটা জাতিকে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে খাজা নাজিমুদ্দিন আইন পরিষদে বাঙালিরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবে মর্মে ঘোষণা দিলে বঙ্গবন্ধু তত্ক্ষণাত্ এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নিয়ে এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের প্রস্তাবের মাধ্যমে সংগ্রাম পরিষদটি গঠন করেন যা ভাষা আন্দোলনকে তীব্রতর করে। ১১ মার্চ ‘বাংলাভাষা দাবি দিবস’ হিসেবে কর্মসূচি পালনে বিশেষ ভূমিকা রাখে ছাত্রসমাজ। তত্কালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্য শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। প্রতিবাদে ১২ মার্চ ও ১৫ মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন চাপের মুখে বাধ্য হয়ে ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ৮ দফা দাবি পূরণে স্বাক্ষর করেন।
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভায় জিন্নাহ্ ঘোষণা দেন, ‘উর্দু, এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তার ঘোষণায় উপস্থিত জনতা ‘না না’ ধ্বনিতে চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবেশেও একই ঘোষণা দেন এবং সেখানে উপস্থিত ছাত্ররাও ‘না না’ বলে জিন্নাহর কথার প্রতিবাদ জানায়। ১৯৫২ সালের ২৫ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’। এর প্রতিবাদে বন্দি থাকা অবস্থায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে বাংলার রাষ্ট্রভাষা করার দাবিদিবস হিসেবে পালন করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। একই সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু এই দাবিতে জেলখানায় অনশন শুরু করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রতিবাদ মিছিল বের করলে এই মিছিলে পুলিশ নির্মমভাবে গুলিবর্ষণ করে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর প্রমুখ শহিদ হন। বঙ্গবন্ধু জেলখানা থেকেই ছাত্রমিছিলে পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেন। পাকিস্তানি জান্তার এহেন পৈশাচিক বর্বরতার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু একটানা ১৭ দিন অনশন চালিয়ে যান এবং জেলখানা থেকেই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে নিবিড় যোগাযোগ রাখেন। বন্দি থাকা সত্ত্বেও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব প্রদানের দায়ে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা জেলখানা থেকে ফরিদপুর জেলখানায় স্থানান্তর করা হয়। অবশেষে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালির মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা, প্রাণের ভাষাবাংলা।
১৯৭১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক আহ্বান করেন। কিন্তু পরবর্তী সময় ১ মার্চে ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের বৈঠকটি স্থগিত ঘোষণা করার প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল পালিত হয়। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্ভাসিত ছাত্রনেতারা ২ মার্চ প্রথমবারের মতো বাংলার মাটিতে লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন করতে সক্ষম হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর নির্যাতন ও প্রতারণার দীর্ঘ ২৩ বছরের ইতিহাস তুলে ধরেন। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যার কাছে যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব—এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম—এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয়বাংলা।’
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে বাংলার জনগণ দৃঢ় চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ হন। পূর্ব পাকিস্তানের সব কার্যক্রম অচল হয়ে যায়। রেডিওতে, ঘরে ঘরে, মানুষের মুখে মুখে বাজতে থাকে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়/হবে হবে হবে জয়, হবে নিশ্চয়/কোটি প্রাণ একসাথে/জেগেছে অন্ধরাতে/নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়’। পরিস্থিতি ভয়াবহ বুঝে তত্কালীন পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসে। এরপর আসে পশ্চিম পাকিস্তানের তত্কালীন বৃহত্তম দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো। ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ভুট্টো ও ইয়াহিয়া আলোচনার নামে নানা অজুহাতে সময় অতিবাহিত করতে থাকে। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর হত্যা পরিকল্পনায় অপারেশন সার্চলাইট নামক নীল নকশা তৈরি করে। হত্যাযজ্ঞের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ২৫ মার্চ রাতে ভুট্টো এবং ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে।
২৫ মার্চ রাতেই ঘুমন্ত বাঙালির ওপর শুরু হয় বর্বরোচিত গণহত্যা। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ২৫ মার্চ কালরাত্রি নামে পরিচিত। কালরাত্রি অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে রাত পোহানোর আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন হানাদার বাহিনীর করতলগত হয়ে যাওয়ায় পরদিন চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্থাপিত অস্থায়ী বেতারকেন্দ্র থেকে জাতির পিতার এ ঘোষণা সম্প্রচার করা হতে থাকে। সমগ্র জাতি, অর্থাত্ বাংলাদেশের সে-সময়কার সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির প্রায় সবাই পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে হানাদারমুক্ত হয় বাংলাদেশ। বীর বাঙালি জাতি তাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনায় এই মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। তাই ২৬ মার্চ বাঙালি জাতির স্বাধীনতা দিবস।
১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মদিন। বাঙালি জাতির মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের এই গৌরবের মাস মার্চেই জন্মগ্রহণ করেন তত্কালীন ফরিদপুর (বর্তমান গোপালগঞ্জ) জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। বাংলাদেশে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন এবং শিশু দিবস একসঙ্গে উদ্যাপন করা হয়ে থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর ১৭ মার্চ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় এবং ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে পালন করা হয়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে সংগত কারণেই, এবারের মার্চ মাসটি আমাদের জাতির ও জাতির পিতার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। শীতের পর বসন্ত ঋতুর এ মাসটি বাঙালির মধ্যে নবপ্রাণের ও প্রণোদনার সঞ্চার করে। এ মাসেই পেয়েছি আমরা আমাদের মহান নেতা স্বাধীন বাংলার রূপকার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এ মাসেই পেয়েছি আমরা বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। এ মাসেই পেয়েছি আমরা স্বাধীনতার ঘোষণা। যতদিন বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি এ পৃথিবীতে টিকে থাকবে, মার্চের নাম নানা উপলক্ষ্যে বারবার স্মৃত ও উল্লিখিত হতেই থাকবে। বাংলাদেশের স্রষ্টা রাজনীতির মহাকবি আজ সশরীরে আমাদের মাঝে না থাকলেও তার মানবতা, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, দর্শন, বাঙালি সাংস্কৃতিক চেতনা এবং তার স্পিরিট মহাকাল বহন করবে।
জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!
লেখক : কলামিস্ট, গবেষক, ফোকলোরিস্ট, ইংরেজির অধ্যাপক ও
সাবেক উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া