গণনিধনের সেই রাতে আমি ঢাকায় ছিলাম।
তার পরের দিন সকালে আমি ইতস্তত হাঁটতে
বের হই এই পুরাতন শহরটির পথে।
আমি তোমাকে স্পষ্ট করে বলতে চাই,
মৃত্যু যেন ছায়া হয়ে নীরবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সারা শহরে।
ধোঁয়া ও আগুনের স্তূপ ছড়ানো ছিল যত্রতত্র।
মৃত্যু আর ধ্বংসের বিষাক্ত গন্ উদগীরণ হচ্ছিল সমস্ত শহরে
হাজার হাজার মানুষের লাশ...
আমি আসলে পুরো চিত্রটি কিছুতেই বলতে পারব না।
আমি কেবল চেষ্টা করতে পারি যতটা সম্ভব
সত্যের কাছাকাছি যাবার।
পুত্রকে হত্যা করা হয়েছিল অভাগা মায়ের সামনে
কন্যাকে বীভত্স নিপীড়নে শেষ করা হয়েছিল
অসহায় বাবার সামনে...
এভাবেই লাশে লাশে শহরটি হয়ে ওঠে নিঃস্ব, বন্ধ্যা, নিষ্প্রাণ।
এক গভীর হা-হুতাশার ফিসফিসানি গুমরে মরে সর্বত্র।
আমি এক রাস্তা থেকে অন্য রাস্তায় পাক খেয়েছি,
আমি এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে হন্যে হয়েছি।
যা দেখেছি তা হার মানায় সবচেয়ে ভয়ানক দুঃস্বপ্নকে
নির্যাতিতা মেয়েদের নগ্ন মৃতদেহ, তরুণ-যুবকদের বুলেটবিদ্ধ মৃতদেহ,
মায়েদের বিকৃত প্রাণহীন লাশ আর বেয়নেটের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত
শিশুদের মৃতদেহগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল শহরের আঁকেবাঁকে।
হায় ঈশ্বর! মানুষের জীবন কত সস্তা আর মূল্যহীন হতে পারে—
তারই উদগ্র চিহ্ন জমাট বেঁধেছিল শহরটির সমস্ত দিকচক্রবালে।
সকালে যা কিছু দেখলাম তা কেবল মাংস এবং রক্তের মিশ্রণ!
রাস্তার পাশে দেখলাম একটি নিষ্পাপ শিশু তার
মৃত মায়ের বুক থেকে দুধের সন্ান করছে।
পরের বার সেখানে গিয়ে দেখি মায়ের লাশ নেই। কিন্তু শিশুটি?
হায় অভাগা শিশু! কাছাকাছি একটি খাদে ঠাঁই হয়েছে তার।
আর সেখানেই তার প্রাণহীন চোখ দুটিকে খুবলে খাচ্ছে দুটি দাঁড়কাক!
বলে বোঝানো যাবে না—কী ভয়াবহ লোমহর্ষক সেই দৃশ্য!
ভয়ে আমি চিত্কার করে উঠলাম।
হায় ঈশ্বর! এ কেমন প্রেতপুরী! এ কেমন নরক!
আমি এই দৃশ্যগুলো মনে রাখতে চাই না।
আমার নিউরন থেকে মুছে দাও এসব বীভত্সতা।
আমি তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি হে ঈশ্বর!
আমাকে বোবা করে দাও, আমাকে স্মৃতিহীন করে দাও।
আমাকে শব্দহীন করে দাও। আমাকে রক্ষা করো!
আমি আর কখনো ঢাকা আসতে চাই না।
বরেন চক্রবর্তীর কবিতার বই A Nation Confesses (অবসর, ২০১৪) থেকে Dhaka on twenty-sixth morning- in the eyes of a Foreign Journalist কবিতার ইংরেজি ভাবানুবাদ।
ভাষান্তর : তাপস কুমার দত্ত