মহাকালের নিকট ৫০ বত্সর বুদ্বুদ মাত্র; কিন্তু জীবনের ব্যাপ্তির তুলনায় সুবর্ণজয়ন্তী মানুষের অর্ধেক জীবনের কাছাকাছি। দেখিতে দেখিতে বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বত্সরের মাইলফলকটি সগৌরবে স্পর্শ করিল। ৫০ বত্সর পূর্বে আমরা যেমন কল্পনা করিতে পারি নাই একবিংশ শতাব্দীর একুশ সালে আসিয়া কেমন হইবে আমাদের দেশটি, তেমনি আরো ৫০ বত্সর পর স্বাধীনতার শতবর্ষে কেমন বাংলাদেশ হইবে—আমরা তাহা এখনই ধারণা করিতে পারিব না; কিন্তু একটি বিষয় ধারণা করিতে পারিব—বাংলাদেশ অগ্রসর হইবে অসীম সম্ভাবনার দিগন্তে। আর এই অসীম সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করিয়া দিয়াছে আমাদের স্বাধীনতা। একটি ভূখণ্ডের জন্য ‘স্বাধীনতা’ কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তাহা শতাধিক বত্সর পূর্বে কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় মাত্র দুইটি পঙিক্ততে বলিয়া গিয়াছেন—স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়/ দাসত্বশৃঙ্খল কে পরিবে পায় হে কে পরিবে পায়।’ আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আমরা স্বাধীনতার সূর্যকে আমাদের পলিমাটির পূর্বদিগন্তে উদয় ঘটাইতে পারিয়াছি। ইহার মূল্য যে কতটা অপরিসীম—তাহা, স্বাধীনতার জন্য এখনো যেই সকল জাতি মাথা কুটিতেছে, তাহারাই সবচাইতে ভালো জানেন।
স্বাধীনতার এই রক্তিম সূর্য ছিনাইয়া আনিতে আমাদের অবশ্য অশেষ মূল্য চুকাইতে হইয়াছে। একসাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করিয়াছি অমূল্য এই স্বাধীনতা। একাত্তরের ৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছিলেন—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অতঃপর ২৫ মার্চের কালরাত এবং ২৬ মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণা। দীর্ঘ প্রায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে সকল দিক দিয়া বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত আমাদের যেইভাবে সহযোগিতা করিয়াছিল, তাহারও তুলনা হয় না। আজিকার এই সুবর্ণক্ষণে মুক্তিযুদ্ধের সকল সূর্যসন্তানদের আমরা জানাই অন্তরনিঃসৃত অসীম ভালোবাসা। স্বাধীনতা পাইয়াছিলাম বলিয়াই আমাদের সম্মুখে খুলিয়া গিয়াছিল সম্ভাবনার অসীম দিগন্ত। যদিও সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি লইয়া সেই সময় বিশ্বব্যাংক বলিয়াছিল—সবচাইতে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল। ১৯৭৬ সালে লন্ডন হইতে নরওয়ের অর্থনীতিবিদ জাস্ট ফাল্যান্ড এবং মার্কিন অর্থনীতিবিদ জে আর পার্কিনসন বলিয়াছিলেন—বাংলাদেশ হইতেছে উন্নয়নের একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। বাংলাদেশ যদি তাহার উন্নয়ন সমস্যার সমাধান করিতে পারে, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে পৃথিবীর যে কোনো দেশই উন্নতি করিতে পারিবে। কী ভয়ংকর প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়া আমরা সমৃদ্ধির সোপানে পা রাখিয়াছি, তাহা এই সকল গবেষণা প্রতিবেদন হইতে স্পষ্ট হইয়া গিয়াছিল। বাংলাদেশ সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করিয়াছে। বিগত অর্ধশতকে আমাদের অর্থনৈতিক সামষ্টিক প্রবৃদ্ধি ৭৩ গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে, মাথাপিছু আয় বাড়িয়াছে ১৫ গুণ, সিংহভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আসিয়াছে এবং ৭৫ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পাইতেছে। শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়াছে, যদিও মান লইয়া প্রশ্ন আছে। আমরা বহু সূচকেই এই অঞ্চলের উন্নয়নের গড় হইতে উপরে রহিয়াছি। তবে ইহা দুঃখজনক যে, পরাধীনকালে কয়েক জন মাত্র বিদেশি লুণ্ঠনকারী থাকিলেও এখন শত শত স্বদেশি লুণ্ঠনকারী সৃষ্টি হইয়াছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাহাকে ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’ বলা হয়, তাহা স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরে ‘একধরনের পরাধীনতা’র বীজ রোপিত করিয়া থাকে। সেই বীজ হইতে অঙ্কুরিত বৃক্ষকে লালন করা হয় লুটেরা মানসিকতার সংকীর্ণতা হইতে। কল্যাণকর রাষ্ট্রের জন্য ইহা বিষবৃক্ষের ন্যায়। এই সকল সমস্যার সমাধান রাতারাতি হইবারও নহে। সুতরাং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে রাষ্ট্রীয় অপচয় ও দুর্নীতির দিকেও আমাদের দৃষ্টি দিতে হইবে।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল এবং পরবর্তী কয়েক দশকে উন্নত রাষ্ট্র হইবার মহিসোপনে যাত্রা করিতেছে। উন্নয়নশীল এবং উন্নত রাষ্ট্র হইবার অন্যতম শর্ত হইল বাংলাদেশকে ইহার পাশাপাশি কল্যাণকর রাষ্ট্রও হইতে হইবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যেই লক্ষ লক্ষ মানুষ আত্মত্যাগ করিয়াছেন, আমরা যদি একটি কল্যাণকর ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন করিতে পারি, তবে উহাই হইবে লক্ষ লক্ষ শহিদের প্রতি সত্যিকারের সম্মান জ্ঞাপন।