সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। মার্চ মাসের পঁচিশ তারিখ ছিল ভরা চৈত্র। আকাশে মেঘের কোনো চিহ্ন নেই। তারই মধ্যে মুহুর্মুহু স্লোগান সর্বত্র। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। মিছিলের পর মিছিল ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-নারী-পুরুষ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবারই পদচারণায় প্রকম্পিত রাজপথ।
আমি তখন দয়াগঞ্জ, নারিন্দা, যাত্রাবাড়ী, মইসুন্দি, ওয়ারি জুড়ে যে বিশাল অঞ্চলটি রয়েছে তার সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার যুগ্ম-আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। পরবর্তীতে তিনি বীরত্বের জন্য ‘বীরবিক্রম’ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। আমাদের গোপন দপ্তর ছিল নবাবপুর রোডে। সেখানে আমরা অস্ত্র ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলাম পাকিস্তানি বাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য। আমাদের উদ্যোগে তখন বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড এবং পরিখা খনন করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যদিও সে সময় মনে হতো আমরা একটা বিশাল কিছু করছি এবং কোনোমতেই শত্রুকে এলাকায় প্রবেশ করতে দেব না। কিন্তু আমাদের ধারণাই ছিল না যে, আমাদের এই প্রতিরোধ কর্পূরের মতো উবে যাবে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের মুখে। তখন আমরা কখনো সাইকেলে, কখনো দৌড়ে সংযোগ রক্ষা করে যাচ্ছি। রিকশা শ্রমিক, স্থানীয় দিনমজুর সবাইকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছি।
আমি দৈনিক ইত্তেফাকে তখন ডেস্কে চাকরি করি। সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। আমার ডিউটি ছিল সেদিন রাত্রে। সেই রাত্রের শিফটে যারা সে সময় ছিলেন, তাদের মধ্যে এখন কেবলমাত্র একজনই বেঁচে আছেন আমি ছাড়া। তিনি স্টাফ রিপোর্টার সৈয়দ শাহজাহান। বয়সের কারণে তিনিও বোধহয় শয্যাশায়ী। রিপোর্টিংয়ে আরেক জন কর্মঠ লোক ছিলেন, তার নাম আমির হোসেন। যিনি আওয়ামী লীগের সংবাদ সংগ্রহ করতেন। সন্ধ্যায় যখন আমি দৈনিক ইত্তেফাকে আসি, তখন সমস্ত রাস্তায় ছিল লোকে লোকারণ্য এবং সব মানুষের চোখেমুখে ছিল বিপুল উত্কণ্ঠা। সবারই উত্কণ্ঠিত প্রশ্ন, মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনার অগ্রগতি কি? জুলফিকার আলী ভুট্টো কি ঢাকায় আছেন, নাকি ঢাকা ছেড়ে গেছেন? এসব প্রশ্ন বাতাসে ছুটে বেড়াচ্ছে অস্থিরভাবে। আমি অফিসে প্রবেশ করতেই আমাদের বার্তানির্বাহী সম্পাদক শহিদ সিরাজুদ্দীন হোসেন (একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে আলবদরের হাতে উনি শহিদ হন) আমাকে বললেন, কোনো রকম দেরি না করে টেলিফোনের কাছে বস এবং বত্রিশ নম্বরে সব সময় যোগাযোগ রাখ। আমাকে বলা হলো, তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে সমস্ত নির্দেশাবলি নিয়ে সেগুলো লিপিবদ্ধ কর। অন্যদিকে, বিভিন্ন সূত্র থেকে পরিস্থিতি জানার জন্য নানা রকমের প্রশ্ন তো করা হচ্ছেই।
রাত্রি সাড়ে ৮টা নাগাদ বার্তাকক্ষে এলেন মোতাহের হোসেন সিদ্দিকী। তিনি ছিলেন এক সময়ে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহকারী। তিনি খুব নত স্বরে সিরাজ ভাইয়ের কাছে গেলেন এবং তাকে বললেন ইত্তেফাকে না থেকে তার চামেলীবাগের বাড়িতে চলে যেতে। যেটা সিরাজুদ্দীন হোসেন প্রত্যাখ্যান করেন। মোতাহের হোসেন সিদ্দিকী এই তথ্যও জানিয়ে দিলেন যে, আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সম্ভবত ঢাকা পরিত্যাগ করছে এবং যে কোনো মুহূর্তেই সেনাবাহিনী রাজপথে নেমে যেতে পারে। মোতাহের হোসেন যা বলে গেলেন আমরা কিছু জানলাম না। আমাদের কেবল বলা হলো— তোমরা কাজ করে যাও। এদিকে আমরা খবর পাচ্ছি বিভিন্ন সূত্র থেকে যে, যে কোনো মুহূর্তে পাকবাহিনী রাস্তায় নেমে পড়তে পারে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে এবং আন্দোলন দমনের জন্য তারা যে কোনো পর্যায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
রাত্রি ১০টা ৩৫ মিনিট। শাহবাগে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের অবস্থান থেকে একটি টেলিফোন এলো ইত্তেফাকে। একজন খুব শঙ্কিত কণ্ঠে বলছেন, আমাদের ট্রান্সমিশন শেষ হবার পরে একটি মিলিটারি কনভয় বেতার ভবনে ঢুকে কয়েকটা বস্তা রেখে গেছে। কোনো ভয়ংকর কিছু ঘটবে বলে মনে করছি। এটুকু বলেই তিনি ফোন কেটে দিলেন। ইতিমধ্যে আরো কিছু খবরাখবর আসছিল। অনেকেই একথাও জানতে চাচ্ছিলেন যে, সেনাবাহিনী রাস্তায় নেমে পড়েছে কি না? পুরো বিষয়টি আমি সিরাজ ভাইকে জানালাম। এদিকে বিভিন্ন জায়গায় গুলি এবং হাত বোমার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সিরাজ ভাই সবাইকেই তাড়া দিলেন আমরা যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাতের কাজগুলো শেষ করি এবং প্রেসে পাঠিয়ে দেই। তার পরিষ্কার নির্দেশ ছিল—যেভাবেই হোক আগামীকালের পত্রিকা প্রকাশ করতেই হবে। চিফ সাব-এডিটর আসফ-উদ-দৌলা রেজা, শিফট ইনচার্জ মোহাম্মদ-দৌলা চৌধুরী, সাব-এডিটর ইয়াহিয়া বখত, রিপোর্টিংয়ে সৈয়দ শাহজাহান এই রকম সাত-আট জন আমরা ডেস্কে কাজ করে চলেছি। গোপীবাগ থেকে সহকারী সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন ঘুরতে ঘুরতে অফিসে এসে বললেন, রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমরা যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শেষ করে যার যার মতো বেড়িয়ে যাই। কারণ যে কোনো মুহূর্তে রাস্তায় মিলিটারি নেমে যেতে পারে। আমরা তার আভাসও পাচ্ছিলাম। গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছিল। শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল চিত্কার। রাত্রি সাড়ে ১১টার দিকে ‘দৈনিক পূর্বদেশ’-এর সম্পাদক এহতেশেম হায়দার চৌধুরী খুব সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আপনারা যদি পারেন পত্রিকা বের করেন আমরা পারলাম না।’ একটু পরে আমি ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকায় টেলিফোন করলাম জনাব তোয়াব খানের কাছে। তিনিও বললেন, ‘আমরা গোলাগুলির মধ্যে রয়ে গেছি, আমাদের পক্ষেও আজকের পত্রিকা বের করার কোনো উপায় নেই।’ এই কথা সিরাজ ভাইকে জানাতেই তিনি বললেন, ‘ওপরের বার্তাকক্ষের সমস্ত আলো নিভিয়ে দিয়ে নিচের মেশিনরুমে চল সবাই। সেখানে বসেই আমরা পত্রিকা প্রকাশের ব্যবস্থা করব।’ তার নির্দেশমতো আমরা সবাই চলে গেলাম নিচের মেশিনরুমে। সেখানে বসেই আমরা একাত্তরের দৈনিক ইত্তেফাকের ২৬শে মার্চের সংখ্যাটি মেকআপ করে সাজিয়ে প্রেসে দিয়ে দিলাম। ইতিমধ্যে আমাদের সমস্ত টেলিফোনসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ৩২ নম্বরে টেলিফোন করেও বোঝা গেলো সেখানে লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে। ওপরের অন্ধকারের মধ্যে বার্তাকক্ষে চলে এলাম দোতলায়। সেখানে বসেই বুঝলাম কি পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে। চারদিকে আগুন, যেন আমরা এক অগ্নিবলয়ের মধ্যেই আছি। অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের কর্ণবিদারি আওয়াজ শুনছি। শুনছি ট্যাংকের ভয় ধরানো গতি, সামরিক আর্মি কনভয়ের চলাচলের শব্দ। বিভিন্ন দিক থেকে আর্তনাদ, কান্না, চিত্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম ফসফরাস বোমায় চারদিক আলোকিত হওয়া এবং তার মধ্যেই একটানা মেশিনগানের গুলি। চিত্কার-কান্না ক্রমান্বয়ে নিস্তেজ হয়ে আসছিল। এর মধ্যে দুই বার ইত্তেফাক অফিসের ভবনটি লক্ষ্য করে আর্মি কনভয়ের ভেতর থেকে মেশিনগানের গুলি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে, এই অবস্থান বেশিক্ষণ নিরাপদ থাকবে না। এরই মধ্যে একটি আর্মি কনভয় এসে ইত্তেফাক ভবনের দোতলা লক্ষ করে মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করল এবং তাতে আমাদের ক্যান্টিনের একটি কিশোর ঢলে পড়ল মাটিতে। নিউজপ্রিন্ট দিয়ে রক্ত বন্ধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম আমরা। তারপর আমি সেই গুলিবিদ্ধ দেহটি কাঁধে বহন করে নিকটবর্তী একটি মসজিদের অজু করার স্থানে রেখে ফিরে এলাম। আমার ফিরে আসার কারণ সংবাদপত্র জগতের আমার প্রিয় অভিভাবকদের ফেলে কোথাও যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। প্রকৃতপক্ষে আমরা সামরিক বাহিনী দ্বারা এক রকম অবরুদ্ধই হয়েছিলাম। ২৬ তারিখের প্রত্যুষেই আর একবার একটি মিলিটারি কনভয় হামলা চালালো ইত্তেফাক অফিসে। এদিন প্রত্যুষে মিলিটারি কনভয়ের ছোড়া গুলি থেকে সৌভাগ্যবশত আমরা তিন জন বেঁচে গেলাম। তবে এক নিরীহ হকার যে ভোরের পত্রিকাটি সংগ্রহ করতে ইত্তেফাকে এসেছিল তাকেই প্রাণ দিতে হলো সেই হামলায়। এর পরেই শুরু হলো আমাদের আত্মরক্ষার পরিকল্পনা। কিন্তু ইত্তেফাক ভবন থেকে বেরোনোর কোনো উপায় ছিল না। চারদিকেই মৃত্যুদূত।
এমন সময় নিচে থেকে একজন প্রহরী জানালো যে, একটি মিলিটারি গাড়ি থেকে কিছু জোয়ান এসে আমাদের মেশিনের ওপরে কিছু পাউডার ছিটিয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি ট্যাংক এসে ইত্তেফাক অফিসের সামনে দাঁড়ালো, প্রচণ্ড শব্দে গোটা দালানটি নড়ে উঠলো আমরা দেখলাম চারদিকে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। বুঝলাম এই ট্যাংক থেকেই এই গোলাবর্ষণ করা হয়েছে ইত্তেফাক অফিস ভস্মীভূত করার জন্য। সেই অগ্নিবলয় থেকে আত্মরক্ষার সেই কাহিনি আজ এতকাল পড়ে মনে পরলেও শিহরিত হই। সেদিন ইত্তেফাকের সেই অগ্নিকুণ্ড আমাদের ভেতরে আর এক দাবানল সৃষ্টি করেছিল। ঐ ভস্ম থেকেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম হানাদারদের রুখবই।
লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক