বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের গৌরবজনক ঘটনা বা অধ্যায় হচ্ছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। যে যুদ্ধে নিজের জীবনকে উত্সর্গ করে দেশমাতা ও মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন বীরমুক্তিযোদ্ধারা। উন্নত রাষ্ট্র এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসৃমদ্ধ প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। আর এ কাজটি যদি হয় সরাসরি একজন বীরমুক্তিযোদ্ধার মাধ্যমে, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে।
বীরমুক্তিযোদ্ধা কালাম, মাত্র ৫০ গজ পেছনের শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে ঝাঁপিয়ে পড়লো শেওলা ঢাকা পুকুরে। মুহূর্তেই হারিয়ে গেলেন তিনি। পাকি সেনারাতো অবাক, যে লোকটাকে এইমাত্র পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেলো সেই লোকটা কোথায় হারিয়ে গেলো? নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছিলো না। পাকিস্থানি সেনা আর রাজাকাররা বিশ্বাসই করতে পারছিলোনা এরকম একটি মজা পুকুরে মানুষ ডুব দিয়ে দীর্ঘক্ষণ থাকতে পারে। পুকুরের চারদিক খোঁজে তাদের মূল শিকার কালামকে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে এক পর্যায়ে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে এলাকা ত্যাগ করে। সেদিন অসীম সাহস আর তীক্ষ্ম বুদ্ধির কারণে পানিতে ভেসে থাকা একটি ডুমুর গাছের ছোট শেকড় আকড়ে ধরে কোনো রকম শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচেছিলেন বীরমুক্তিযোদ্ধা কালাম। এই আক্রমণে তাঁর সাথের তিনজন বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন। এভাবেই ‘মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ পর্বে কথা বলছিলেন রণাঙ্গণের অকুতভয় বীর, রাজনীতিক, শিক্ষক, খুলনার পাইকগাছা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ।
তিনি জানান, তার স্মৃতিতে জমা আছে অসংখ্য বীরত্বগাঁথা মুক্তিযুদ্ধের গল্প। এর মধ্যে তাঁর স্মৃতিতে বিশেষ স্থান দখল করে আছে কুপিলমুনির যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর শুরু হয়ে একনাগাড়ে চলে ৩ দিন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি ছিলো সাড়া জাগানো একটি যুদ্ধ। বীরমুক্তিযোদ্ধা কালামের ভাষ্য অনুযায়ী, কপিলমুনি বাজারে রাজাকাররা একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করে নিরীহ মানুষদের উপর চালাতো নানা ধরনের অত্যাচার । একাধিকবার অভিযান চালিয়েও এই ক্যাম্পের ক্ষতি সাধন করতে পারেননি বীরমুক্তিযোদ্ধারা। এক পর্যায়ে বিভিন্ন দলের মুক্তিযোদ্ধারা একত্রিত হয়ে কাম্পে সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রায় ৩-৪’শ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আক্রমণ করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। কোন দল কোন দিক দিয়ে আক্রমণ করবে, করা হয় নকশা। এই আক্রমণের অন্যতম একজন সদস্য ছিলেন বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ। পূর্ব পরিকল্পনা এবং নকশা অনুযায়ী ৩ ডিসেম্বর রাজাকার ক্যাম্পকে টার্গেট করে চারদিক থেকে শুরু করে আক্রমণ। তিনদিন যুদ্ধ করার পর রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বন্দী করা হয় ১৫৫ জন রাজাকারকে। তাদের বিচারের জন্য গঠিত হয় গণআদালত। গণআদালতের বিচারে তাদের দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড এবং তাত্ক্ষণিকভাবে তাদের দণ্ডও কার্যকর করা হয়। এরপর সংঘঠিত খুলনা শহর দখলের যুদ্ধেও বীরমুক্তিযোদ্ধা কালাম সাহসী ভূমিকা রাখেন। খুলনা মুক্ত হয় ১৭ ডিসেম্বর। সার্কিট হাউজ ময়দান ও শহীদ হাদিস পার্কে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা যাতে অংশ নেয়ার সুযোগ পান কালামও, যা ছিলো তাঁর জীবনের অন্যন্য অর্জন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট জানাতে গিয়ে বীরমুক্তিযোদ্ধা কালাম জানান, তিনি ছিলেন স্বাধীনতাকামী একজন মানুষ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিলো তাঁর হূদয় জুড়ে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণই মূলত তাকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে উদ্দীপ্ত করে।
তিনি বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণ আমরা রেডিওর মাধ্যমে শুনতে পাই ৮ মার্চ সকালে। এই ভাষণ শুনে আমরা গ্রামবাসীরা অনুপ্রাণিত হলাম। আমরা অনুভব করলাম এই দেশটাকে স্বাধীন করা দরকার। ভাষণ শুনে মনে মনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম।
২৬ মার্চ যখন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। গ্রামের জুনিয়র কয়েকজন ছেলেকে ডাকলাম, তাদের বোঝালাম বসে থাকলে দেশ স্বাধীন হবে না। দেশ স্বাধীন করতে হলে যুদ্ধে যেতে হবে। এরপর আমরা সাতজন একমত হলাম। পারিবারিকভাবে বলে দিলাম আমরা মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছি।
প্রশিক্ষণ নিতে চলে গেলাম ভারতে। ভারত থেকে মাসখানেক অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে যথাসময়ে ফিরে এলাম বাংলাদেশে। এসে রণাঙ্গণে ঐক্যযুদ্ধ, গেরিলা যুদ্ধ, সুম্মুখযুদ্ধসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে লাগলাম।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কালাম বলেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু এক প্রকার সংসার ত্যাগ করেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গেছি। জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করেছি। আমরা জানতাম যুদ্ধে জিতলে বাংলাদেশ পাবো, হারলে জীবন হারাবো। আমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিলো না। যুদ্ধচলাকালীন রাতে রেডিওতে দেশাত্ববোধক গান শুনে সাহস পেতাম, উত্সাহিত হতাম। সরকারের বিভিন্ন ঘোষণা অনুযায়ী কাজ করতাম। তিনি বলেন, আমরা বেতন ভাতার চুক্তি করে মুক্তিযুদ্ধে যাই নি। আমরা দেশকে ভালোবেসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক বয়স হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি আমরা মুক্তিযোদ্ধারা যাতে চিকিত্সা ফ্রি পেতে পারি তিনি যেন সে ব্যবস্থা করে দেন।
তিনি বলেন, আমি চারবার বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পেয়েছি। সামনা-সামনি কথা হয়েছে। তিনি ১৯৭০ সালে একদিন গভীর রাতে লঞ্চে করে খুলনায় এসেছিলেন নির্বাচনি কাজে। লঞ্চঘাটেই ওনার সাথে আমাদের দেখা হলো। তিনি সেসময় বলেছিলেন আমি বেশি কথা বলবো না। তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছো। আমরা শীঘ্রই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তোমরা ইয়াং মানুষ। এর আগে নির্বাচনটা করে নেই। নেতৃত্ব ঠিক হোক। না হলে দেশটার নেতৃত্ব কে দেবে? এখন আমরা নির্বাচনের কাজটাই করি।
বীরমুক্তিযুদ্ধা কালাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েই আমরা ৯ মাস যুদ্ধ করেছি। বঙ্গবন্ধুর ইশারায় আমরা অস্ত্র জমা দিয়েছি। তবে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জমা দেইনি। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সোনার বাংলা গড়ার লক্ষে কাজ করি। মুক্তিযুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করেছি, এখন আমাদের দরকার অর্থনৈতিক মুক্তি। এ প্রজন্ম স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে, এই স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশগড়ার কাজে তাদের নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। এটাই আমার নতুন প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা।