গত কয়েক মাস ধরিয়া করোনা সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকিলেও মার্চের প্রথম সপ্তাহের পর হইতে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাইতেছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে ভর্তির ঘটনাও বৃদ্ধি পাইয়াছে। দেশে শীতকালে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা থাকিলেও সৌভাগ্যক্রমে ডিসেম্বর হইতে মার্চ পর্যন্ত সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম ছিল। ধারণা করা হইয়াছিল, ধীরে ধীরে সংক্রমণের হার কমিয়া আসিয়া জীবনযাত্রা সহজ স্বাভাবিক হইতে শুরু করিবে। কিন্তু সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করিয়া করোনার এই আকস্মিক ঊর্ধ্বগতি সকলের মাথাব্যথার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বিশেষ করিয়া, গত ৯ মাসের মধ্যে করোনা আক্রান্তের সর্বোচ্চ পরিসংখ্যান ও মৃত্যুহার এই দুশ্চিন্তাকে আরো বেগবান করিয়াছে। গত বত্সরের ৮ মার্চ দেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় এবং মৃত্যুর খবর আসে ১৮ মার্চ। ইহার পর সংক্রমণের আশঙ্কায় সরকার সকল প্রকার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধসহ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। গত বত্সরের তুলনায় এই বত্সর একই সময়ে করোনা সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুহার উভয়ই অধিক। ইদানীং করোনার যে নূতন ধারা লক্ষ করা যাইতেছে তাহা গত বত্সরের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। নূতন বৈশিষ্ট্যের করোনা ভাইরাসটি অনেক বেশি সংক্রামক বলিয়া জানা গিয়াছে। বিভিন্ন রিপোর্ট হইতে জানা যাইতেছে, বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিক করোনা আক্রান্ত রোগীতে কানায় কানায় পূর্ণ হইয়া যাইতেছে। হাসপাতালগুলির আইসিইউ ইউনিটগুলিও খালি পড়িয়া নাই। পাওয়া যাইতেছে না প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও প্লাজমা সেবা। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হইল ইদানীং করোনার এই নূতন ধারায় অপেক্ষাকৃত তরুণরা অধিক আক্রান্ত হইতেছে।
সরকার দেশে ইতিমধ্যে টিকাদান কর্মসূচি চালু করিয়াছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে টিকা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করিতেছে। ঠিক সেই সময় প্রায় কমিয়া আসা করোনা শনাক্তের হার বাড়িয়া যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগের ব্যাপার। সরকার স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালাইয়া যাইতে বলিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ অবহেলার পরিচয় দিতেছে। মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্বের ন্যায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করিয়া বেশির ভাগ মানুষ স্বাভাবিক চলাফেরা ও কাজকর্ম করিতেছে। মূলত সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে মানুষের অবহেলার কারণেই করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উভয়ই বাড়িয়া চলিয়াছে। করোনার এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিও সাধারণ মানুষের অসচেতন জীবনযাত্রায় খুব একটা প্রভাব বিস্তার করিতেছে না। জনসাধারণের স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলিতে যেমন শৈথিল্য ভাব লক্ষ করা যাইতেছে তেমনি সরকারের পক্ষ হইতেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি পালনে বাধ্য করিবার উদ্যোগ দেখা যাইতেছে না। যদিও নিজে সচেতন না হইলে কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা করোনা বিস্তার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখিতে পারিবে না।
ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় আমাদের দেশে জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে করোনার ঝুঁকি অন্যান্য দেশগুলির চাইতে অধিক। দেশে করোনার টিকাদান কর্মসূচি চালু হইলেও যতদিন না সর্বাত্মক এই কর্মসূচির বিস্তার ঘটে এবং টিকার শতভাগ কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়া যায়, ততদিন পর্যন্ত সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী জনসমাগম এড়াইয়া চলা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক ব্যবহারে সচেতন হইবার কোনো বিকল্প নাই। করোনার সংক্রমণের হার যেইভাবে বাড়িয়া চলিতেছে এবং সংক্রমণ যেইরূপে কোনো সময় না দিয়া জীবন কাড়িয়া লইতেছে, তাহাতে এখনই সচেতন না হইলে এবং সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ না করিলে নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাইতে হইবে।