প্রদীপ সাহা
করোনা আবার জানিয়ে দিচ্ছে তার ভয়াবহ আগমনিবার্তা। একটু একটু করে আক্রমণ বেড়েই চলেছে আবার। তার পরও অনেকে ব্যাপারটিকে গুরুত্ব না দিয়ে দিব্যি বলে বেড়াচ্ছেন—করোনা চলে গেছে। করোনা বলতে কিছু নেই অথবা করোনা তাদেরকে কোনোভাবেই আক্রমণ করবে না ইত্যাদি। কিন্তু যে হারে আবার আক্রমণ ও মৃত্যুসংখ্যা নতুন করে বাড়ছে, তাতে রীতিমতো থমকেই যেতে হয়। মনে হয়, আবার সবাই একটা অজানা শঙ্কার দিকে এগোতে যাচ্ছি। বিভিন্নভাবে জনগণকে সচেতন থাকার জন্য বলা হলেও একশ্রেণির লোক ব্যাপারটিকে খুবই হালকাভাবে নিচ্ছেন। তারা যেন ধরেই নিয়েছেন, করোনা আসলে একটি সাধারণ ব্যাপার! তাই তাদের কোনোভাবে সচেতনও করা যাচ্ছে না।
সব মহল থেকেই জনগণকে বেশ জোরালোভাবে মাস্ক ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা। কিন্তু কে শোনে কার কথা! একশ্রেণির মানুষ তো দিব্যি মাস্ক ছাড়াই চলাফেরা করছেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো তোয়াক্কাই করছেন না। অথচ এসব অন্ধবিশ্বাসী মানুষগুলোর জন্য আমরা যারা সচেতন থাকতে চাইছি বা থাকার চেষ্টা করছি, তারা ইচ্ছে সত্ত্বেও সেভাবে সচেতন থাকতে পারছি না। দেখা যাবে, আপনি আপনার প্রয়োজনে বাজারে কিংবা জনসমাগম স্থানে গেলেন। কিন্তু আপনার সামনে বুক ফুলিয়ে মাস্ক না পরে, হাঁচি-কাশি দিয়ে দিব্যি কাছ ঘেঁষে হেঁটে গেলেন সেই বেশি সাহসী লোকটি।
বিশেষ প্রয়োজনে আপনাকে গণপরিবহন ব্যবহার করতেই হয়। সেক্ষেত্রে আপনাকে আরো বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মাস্ক না পরে সেই বেশি সাহসী লোকটি আপনার পাশের সিটে বসে পড়ছেন কিংবা পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক ও বিস্ময়কর যে, আপনি তাকে মাস্ক পরার ব্যাপারে কিছু বললেও তিনি অপ্রয়োজনীয় তর্ক করছেন। গাড়িতে থাকা অন্য যাত্রীরা তাকে কিছুই বলছেন না। তার মানে, আপনি ইচ্ছে করলেও নিরাপদে থাকতে পারছেন না।
মাস্ক ব্যবহারে জনগণকে সচেতন করার জন্য আবার নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ। নো মাস্ক—নো সার্ভিস পদ্ধতি চালু হয়েছে অফিস-আদালতে। মানুষ যাতে মাস্ক ব্যবহার করেন, সেজন্য মাঠে নেমেছে প্রশাসন। গণমাধ্যমেও বারবার প্রচারিত হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা। কিন্তু আমরা শঙ্কিত-চিন্তিত এই ভেবে যে, এতকিছুর পরও সেই শ্রেণির মানুষগুলো কি সত্যিই সচেতন হতে পারবেন? মাস্ক পরার জন্য সরকার কিংবা প্রশাসন যত কঠোর হোক না কেন, যত আইনই করুক না কেন—আমি এবং আপনি নিজে থেকে যদি সচেতন না হই, তাহলে এ উদ্যোগ কতটুকু সফল বা কার্যকর হবে?
গণপরিবহন এবং জনসমাগমস্থলে সহজেই করোনা ভাইরাস আক্রমণ করতে পারে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এ দুটি স্থানেই রয়েছে সচেতনতার সবচেয়ে বেশি অভাব। তাই বিশেষ করে এ দুটি স্থানে জনসচেতনতা নিশ্চিতভাবে আরো বাড়াতে হবে।
গণপরিবহনে দেখা যায়, যাত্রীদের বেশির ভাগই মুখে মাস্ক পরেন না। আবার যদি কেউ মাস্ক ব্যবহার করেন, দেখা যায় তারা মাস্কটি মুখে না দিয়ে গলায় কিংবা হাতে ঝুলিয়ে গাড়িতে উঠছেন। অন্যদিকে, একজনের পর একজন হকার এবং ভিক্ষুক তো আছেই। তাদের অবস্থাও সেই একই রকম। গাড়ির কনডাকটর ভাড়া কাটছে মাস্ক ছাড়া অথবা গলায় ঝুলিয়ে। তাদেরকে বলেও কোনো লাভ হয় না। একইভাবে আগেও চলছে, এখনো চলছে। জনসমাগমস্থলেও একই চিত্র। এখন প্রশ্ন হলো—মাস্ক ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সচেতন করার ভূমিকা কি শুধু সরকার কিংবা প্রশাসনই গ্রহণ করবে, নাকি আমাদেরও ভূমিকা আছে? সহজ উত্তর হলো ‘হ্যাঁ।’ সচেতন থাকাটা হচ্ছে সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছা। আমি-আপনি নিজে যদি সচেতন হই এবং সচেতন থাকার গুরুত্বটি বুঝতে পারি, তাহলে এত উদ্যোগ কিংবা আইনের দরকারই পড়ে না।
আমাদের মাস্ক ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সুফলগুলো বুঝতে হবে। নিজে সচেতন হয়ে, অন্যকেও সচেতন করার চেষ্টা করতে হবে। সবচেয়ে ভয়ংকর এবং আতঙ্কের ব্যাপারটি হলো, আপনি যে লোকটির পাশে বসে আছেন বা দাঁড়িয়ে আছেন অথবা কথা বলছেন, সে-ও তো অজান্তে ভাইরাসটি বহন করতে পারে! কাজেই আপনি যদি অন্তত সঠিক মানের মাস্কটি পরা থাকেন অথবা সঠিক নিয়মে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন, তাহলে আক্রমণের আশঙ্কা কম হবে—এমনটাই শুনিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞ মহল। তাই আসুন, করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচতে আমরা অনেক বেশি সচেতন হই এবং অপরকেও সচেতন করে তুলি। করোনাকে আমরা জয় করব—এ বিশ্বাস এবং শক্তি যেন আমরা সহজেই অর্জন করতে পারি। আর এজন্য আমাদের সচেতন হতে হবে এবং সবার মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জোরালো মনোভাব থাকতে হবে।
n কবি ও কলাম লেখক