পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। পরিবেশবাদীরা সজাগ হয়ে উঠছে। গত কয়েক মাসে পরিবেশের বিরূপ প্রভাব থেকে কিছুটা মুক্তির সুবাতাস পাচ্ছে সারা বিশ্বে মানুষ। যান চলাচল সীমিত থাকার কারণে, শিল্প-কারখানা নিয়ন্ত্রিতরূপে চলার কারণে, সর্বোপরি মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রতিযোগিতায় ঘরবন্দি থাকার কারণে শব্দদূষণ কমেছে, পানি দূষণ কমেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি দহন কমায় কার্বন নিঃসারণ কমেছে। পৃথিবীতে সর্বত্র প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারকে প্রকৃতি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে নিয়েছে। পৃথিবীর আবহাওয়ায় মানুষের জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা যে সীমাহীন উষ্ণতায় বদলে যাচ্ছিল তাতে কিছুটা হলেও ভারসাম্য আসছে। এ পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সমস্যার বাস্তবতা অনুধাবনে মানুষকে আরো বেশি সচেতন করে তুলতে সহায়ক হবে বলে বিশ্বাস। পরিবেশ আন্দোলন গতি পাবে, আন্দোলনকারীরা শক্তিশালী হবে, বিশ্ববিবেক জাগ্রত হবে। পরিবেশ আন্দোলন সফল করতে বিশ্ববিবেক জাগ্রত হওয়া খুবই প্রয়োজন। পরিবেশ সুরক্ষায় আজ পর্যন্ত যত উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে সেগুলো কিছুসংখ্যক ক্ষমতাবান মানুষের জন্য পূর্ণতা পায়নি। দশকের পর দশক ধরে আবেদন নিবেদনের যাঁতাকলে আটকে আছে। তার পরও বিশ্বকে বাসযোগ্য রাখতে হবে যে কোনো মূল্যে। মানব জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্ব পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ও দিনে দিনে মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এমন কোনো ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না যেটাকে সমস্যামুক্ত বলার সুযোগ আছে। মানুষের জীবনে প্রগতি যত গতি পেয়েছে সমস্যা তত গভীর হয়েছে। প্রগতিকে অস্বীকার করার অবস্থায় মানব জাতি আছে বলে মনে হয় না। এক সময় বিশ্বে ১০০ কোটি জনসংখ্যা হতে ১০০ বছর অপেক্ষা করতে হতো আর এখন প্রতি ১০/১২ বছরেই ১০০ কোটি মানুষ বাড়ছে।
প্রকৃতিকে বিরূপ করে তোলার ক্ষেত্রে প্রধানত দায়ী বর্ধিত জনসংখ্যা এবং তাদের নিরন্তর চাহিদা। বিশ্বে মানুষ যে হারে বাড়ছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্যামিতিক হারে চাহিদা বেড়ে চলেছে। মানুষ চোখের সামনে যা যা দেখে সব তার চাই। ৫০ বছর আগে একজন মানুষ বাজারে গিয়ে যদি ১০০ রকমের সামগ্রী দেখতো তাহলে এখন সে দেখে প্রায় ৫ হাজার রকমের সামগ্রী। মানুষ এত সামগ্রী দেখে তা পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। এই প্রতিযোগিতার প্রেষণে পরিবেশ দিনে দিনে তার সুদিন হারিয়ে ফেলছে। পরিবেশ ফিটেস্ট হতে পারছে না, তাই সারভাইভ করতে পারছে না। বিপরীতে মানুষ নিজের অন্তহীন চাহিদার কথা মাথায় রেখে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সামগ্রী হাজির করে জীবনকে সহজ করার প্রচেষ্টায়রত। এতে করে মাটি দূষণ, পানি দূষণ, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ বিপন্ন করে তুলছে পৃথিবীর গতিধারা।
আমাদের পৃথিবীকে আমাদেরই বাঁচাতে হবে এই ধারণায় বর্তমানে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন গতি পাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতিটি সেক্টরে পৃথক পৃথক ভাবে আবার সম্মিলিতভাবে কাজ চলছে। দিনে দিনে কাজে গভীরতা আসছে। এখন সারা পৃথিবীর মানুষ জানে পরিবেশ বিপর্যয় কোনো ধারণা নয়, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব মানে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবসরকালীন সময় কাটানো নয়। পরিবেশবাদীদের সঙ্গে সঙ্গে যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে ঠিক তার পাশাপাশি এ আন্দোলনে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানরা সম্পৃক্ত হচ্ছেন। সবাই যে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে, এমন দাবি করার সময় এখনো আসেনি বরং পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী প্রধান প্রধান দেশ এখনো নীরবতা পালন করছে যা বিশ্ববাসীকে ভাবিত করে।
বিশ্বের যে কোনো জায়গায় যে কোনো কারণে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটলে তার দায় পুরো বিশ্ববাসীকে বহন করতে হয়। বিশ্ব পরিবেশ বিপর্যয়ে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হিসেবে স্বীকৃত হলেও ক্ষয়ক্ষতির বিবেচনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ওপরের দিকেই তার অবস্থান। ধনী শিল্পোন্নত দেশগুলোর দায় অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বহন করতে হচ্ছে। অথচ পরিবেশ বিপর্যয়ের দায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলো কেন বহন করবে? এ প্রশ্ন তোলাই যায়। বিশ্বায়নের আশীর্বাদ হিসেবে বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এ দায় বহন করতে বাধ্য হচ্ছে। সামগ্রিক বিবেচনায় পরিবেশ বিপর্যয়ে এদেশগুলোর ভূমিকা নগণ্য হলেও সমস্যাগুলোকে একেবারে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মানুষ আজ নিজেদের জায়গা থেকে নিজেরা পরিষ্কার থাকতে পারছে না। পরিবেশের প্রতিটা সেক্টরে সৃষ্ট সমস্যা তৈরিতে আমরা পিছিয়ে আছি এমন দাবি করা যাবে না।
বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষায় আইনের কোনো অভাব নেই। পরিকল্পনার কোনো অভাব নেই। অভাব আছে আইনের যথাযথ প্রয়োগে, অভাব আছে পরিকল্পনার আন্তরিক বাস্তবায়নে। ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকার পাঁচটি স্থানকে নীরব এলাকা (নো হর্ন জোন) হিসেবে ঘোষণা করা হলেও তার বাস্তবায়ন গবেষণা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে। যানবাহনের অহেতুক হর্ন, ইঞ্জিন ও ব্রেকের শব্দ, মাইক ও সাউন্ডবক্স ব্যবহার করে উচ্চশব্দ সৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগই নেই। আগের ধারাবাহিকতাই চলমান। আইন মানা বা মানানোর কারো দায় নেই। ফলে রাজধানীর বাসিন্দাদের শ্রবণশক্তি কমে যাচ্ছে, রক্তচাপ-হূদেরাগ-শ্বাসকষ্ট-মাথাধরা-বমি বমিভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়ায় রোগ বাড়ছে ও মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে।
পরিবেশ রক্ষায় দূষণ নিয়ন্ত্রণে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক অনেক সহজ। শব্দ নিয়ন্ত্রণের যেসব বিধিমালা আমাদের আছে তা আন্তরিকতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হলে মুক্তি পাওয়া কঠিন হতো না। আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা দেশ ও জাতির উন্নয়নে ব্যস্ত সময় পার করার কারণে অনেক ছোট ছোট বিষয় বিবেচনায় আসে না। পরিবেশ রক্ষাও সে তালিকায় পড়ে গৌন হয়ে গিয়েছে। কত সময় ব্যয় করে, কত শ্রম দিয়ে বিধিমালা তৈরি করা হলো। আবার বহু শ্রম আর সময় ব্যয় করে বিধিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো। হয়তো বাস্তবায়নের এ কাজ করতেও এক যুগ অপেক্ষা করতে হবে। এতে করে পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হলেও শব্দদূষণে আমাদের রাজধানী বিশ্বের ওপরের সারির শহর। বায়ুদূষণেও রাজধানী পিছিয়ে নেই। মাটি দূষণ আর পানি দূষণে আমাদের ভূমিকাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস পরিবেশে প্রভাব বিস্তার করেছে। এতে করে পরিবেশবাদীরা যে আশার আলো দেখেছিল তা পূর্ণতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রকৃতিও আমাদের কোনো উপকার করতে পারছে না। কারণ আমরা নিজেরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে চাই না। অপরের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাই। নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিন্দুমাত্র বিসর্জন দিতে চাই না। পরিবেশ রক্ষায় এমন মানসিকতার পরিবর্তন হোক। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মুক্তি আসুক।
n লেখক :সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ