নারী এখন ব্যাংকে, বিমানবাহিনীতে, সচিবালয়ে, আদালতে, রাজনীতিতে—কোথায় নেই? বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের এগিয়ে যাওয়ার গল্পে আমি আনন্দ অনুভব করি, আশান্বিত হই। দেশের প্রায় সব শহরের গলির মধ্যেও আজ একজন নারী ছোট্ট একটি দোকান দিয়ে চা বিক্রি করছেন। গ্রামের হাজারও নারী স্রোতের মতো এসে গার্মেন্টশিল্পে যোগ দিচ্ছেন। গ্রামের অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত মেয়েরা শহরে এসে এভাবে কর্মমুখর হয়ে উঠবেন, তা এক সময় কল্পনাও করা যেত না। যে মেয়েরা শ্রম করে, উপার্জন করে তারা মানুষ হিসেবে অনেক বেশি সম্মানিত। এমনকি গ্রাম থেকে শহরে এসে যে নারীরা ‘কাজের বুয়া’ হিসেবে কাজ করছেন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, উপার্জন করছেন, তাঁরা অনেক বেশি সংগ্রামী, প্রত্যয়ী।
নারী-পুরুষ মিলিয়েই সমাজ। কিন্তু একজন নারী এগিয়ে যেতে চাইলে, তাকে পেছন থেকে টেনে রাখার সব বন্দোবস্তই করা হয়। অর্থাত্ একজন নারী পুরুষের সমপথে হাঁটতে চাইলে তাকে দ্বিগুণ শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা শুধু যে একজন পুরুষের মধ্যেই থাকে, তা নয়। কখনো কখনো নারীর মধ্যেও পুরুষতান্ত্রিকতা প্রকটভাবে থাকতে দেখা যায়। এও দেখা যায়, পুরুষ সহকর্মীরা সহযোগিতাপ্রবণ। সেই তুলনায় আরেকজন নারী সহকর্মী অন্য নারী সহকর্মীর প্রতি অনেক বেশি মাত্রায় অসহযোগিতাপ্রবণ।
প্রতিটি মানুষের নিজস্ব চেতনা আছে, বোধ আছে। এখানে দু’ধরনের বাধার বলয় কাজ করে। একটি সমাজ নির্মিত, তার চারপাশে হাজারও বাধা, যাতে সে এগিয়ে যেতে না পারে। আরেকটি বাধা তার কেন্দ্র থেকে, নিজের মধ্য থেকে এক ধরনের বাধার বলয় তৈরি করে। নিজেকে পিছিয়ে রাখা, নিজের মধ্যে পিছিয়ে পড়ার মানসিকতা সৃষ্টি হয়।
শত শত আইন আছে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে। কিন্তু বন্ধ কি হয়েছে? তার মানে নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন না করলে, কখনোই নির্যাতন বন্ধ হবে না।
আমি যদি পরিবর্তন চাই, আমার নিজেকে আগে নিজের চিন্তার পরিবর্তন করতে হবে। জীবন যাপন পরিবর্তন করতে হবে। আমি পরিবর্তিত হলে, পরিবর্তিত হবে চারপাশ, তার আগে নয়। স্বামী স্ত্রী পরামর্শ করে সংসার রচনা করবে। স্ত্রী তার স্বামী-সন্তান-সংসারের জন্য কাজ করবে, যত্ন নেবে। স্বামীও স্ত্রীর দেখভাল করবে। তার পছন্দ-অপছন্দের কাজগুলোকে মূল্যায়ন করবে, গুরুত্ব দেবে সেটাই স্বাভাবিক। স্বেচ্ছাচারিতার নাম তো স্বাধীনতা হতে পারে না।
যে মানুষের মধ্যে মুক্তচিন্তা নেই, যুক্তি নেই, মানবিকতা নেই, বিজ্ঞানমনস্কতা নেই সে-ই পিছিয়ে পড়া মানুষ। পোশাক মানুষকে আধুনিক করতে পারে না, যদি না সে চিন্তাচেতনায় আধুনিক হয়। আমি নারীর পক্ষে কথা বলি বা লিখি মানবিক জায়গা থেকে। নারীকে সবার আগে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে পক্ষ নেই। যে কোনো মানুষই নির্যাতনের শিকার হলে, তার পক্ষ অবলম্বন করাই হচ্ছে মানবিকতা।
পুরুষ আমার জগত্ নয়, জীবন নয়, নিজের জীবন-জগত্ হতে হয় নিজেকে। সেই সমাজেই আমার জন্ম, যেখানে অহরহ ফিমেল ফিটিসাইড ঘটছে। ভ্রূণ হত্যা হচ্ছে। মাতৃগর্ভে মেয়ে ভ্রূণ, তাকে হত্যা কর। সন্তান জন্মের আগেই বাবা-মা ক্লিনিকে গিয়ে পরীক্ষা করছে। ছেলে ভ্রূণ না মেয়ে ভ্রূণ। পুরুষ হলে ভ্রূণ বাঁচিয়ে রাখার শত চেষ্টা করা হয়। নারীকে মেনে না নেওয়ার এই যে প্রবণতা, তা কেবল সমাজকে পিছিয়েই রাখে। নারী আর পুরুষ হচ্ছে প্রকৃতির বৈচিত্র্য। নারী না বাঁচলে পুরুষের জন্মও বন্ধ হয়ে যাবে। নারীরা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এগিয়ে নিয়ে যাবে পুরুষকেও। এ কারণেই নারীর অগ্রগতি নিয়ে আশাবাদী হই।
মৌলভীবাজার