কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিতে সংরকক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে

রেজাউল করিম খোকন

 

গত দেড় দুই দশকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শাকসবজি, ফলমূলসহ কৃষিজাত পণ্য উত্পাদনে দারুণ বিপ্লব ঘটেছে। বিভিন্ন জেলায় কৃষিজাত পণ্যের উত্পাদন কয়েক গুণ বেড়েছে। কৃষকের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে কৃষি। কিন্তু উত্পাদন বাড়লেও মৌসুম ছাড়া সহজলভ্য হয় না বাজারে শাকসবজি ফলফলাদি। এক মৌসুমের সবজি ও ফলের জন্য অপেক্ষা করতে হয় আরেক মৌসুম পর্যন্ত। উত্পাদন সূচক ঊর্ধ্বগামী হলেও দামের বেলায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যায়। মৌসুমের শুরুতে যে সবজি ১০০ কিংবা ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়, তা আবার নেমে যায় ১০ থেকে ২০ টাকায়। দাম না পাওয়ায় খেতের ফসল খেতেই পচতে থাকে। কৃষকরা অনেক সময় রাগে ক্ষোভে তাদের উত্পাদিত ফসল শাকসবজি, ফলমূল ফেলে দেয়। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই। উত্পাদিত কৃষি পণ্য, শাকসবজি, ফলমূল ইত্যাদি দীর্ঘসময়ের জন্য সংরক্ষণ করতে যথেষ্ট পরিমাণ হিমাগার, সংরক্ষণাগার ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন আমাদের কৃষক। এ নিয়ে আশা-নিরাশার দোলা শুধু দেশীয় বাজারেই নয়, রপ্তানির ক্ষেত্রেও চলছে স্থবির অবস্থা। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের দেশীয় সবজি ও ফলফলাদির বেশ চাহিদা থাকলেও সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং সরকারের নজরদারির অভাবে মার খাচ্ছে রপ্তানি খাতও। উত্পাদন সূচকের সঙ্গে বাজার বণ্টন, দামের ভারসাম্য ও রপ্তানি বাড়াতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক মানের আরো অধিকসংখ্যক হিমাগার ও কৃষি পণ্য সংরক্ষণাগার নির্মাণের দাবি কৃষক, ভোক্তা ও রপ্তানিকারকদের। এ দাবি অনেক দিনের। বিশ্বখাদ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের বাণিজ্যিকভাবে যে হারে ফলের উত্পাদন বাড়ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আয়ের একটা বড় অংশ আসবে ফলের বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে।

সাধারণ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে পার্বত্য জেলাগুলোতে আজকাল প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি, ফলমূল উত্পাদন হচ্ছে। সেখানে উত্পাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না থাকায় বাধ্য হয় উত্পাদনকারীদের কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। দীর্ঘসময় ধরে সাধারণভাবে থাকার কারণে সবজি ও ফলমূল পচে যায়। ফলে সেগুলোর মান অনেক নষ্ট হয়। তখন লোকসান গুণতে হয় সংশ্লিষ্ট কৃষক এবং বাজারজাতকরণে নিয়োজিত ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের। তখন তাদের সবাইকে লোকসান গোনা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এভাবেই অনেক কৃষক, উত্পাদনকারী চাষি ও ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে কৃষি পণ্য উত্পাদন খরচ বেড়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক থেকে শুরু করে জমিতে পরিচর্যা, পানি দেওয়া ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরিও বেড়ে গেছে। ফসল উত্পাদনের পর যদি তার উপযুক্ত মূল্য না পাওয়া যায় স্বাভাবিকভাবে কৃষক বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়ে যান। অনেক সময় উত্পাদিত ফসল বাজারে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন কৃষক। খরচ পোষাতে না পেরে কৃষকের খেতের ফসল খেতেই নষ্ট হয়ে যায়। বিক্রি না করে রাস্তায় কিংবা নদীতে ফেলে দেন তারা। এক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় যদি সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত এবং যথেষ্টসংখ্যক হিমাগার কিংবা আধুনিক সংরক্ষণাগার থাকত তাহলে কৃষক অনেক বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেত।

যদিও সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রণোদনা ও প্রদর্শনী খামারের মাধ্যমে কৃষির উন্নয়নে আলাদাভাবে কাজ করছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষক বাজার, এর বাজার ব্যবস্থা সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে এটা সারা দেশে সমানভাবে চালু হয়নি এখনো। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে কথা বলে জানা যায়, মৌসুমের শুরুতে সবজি-ফলমূলের ভালো দাম পাওয়া যায় বটে। কিন্তু ভর মৌসুমে উত্পাদন ও সরবরাহ বেড়ে গেলে সবজি ও ফলমূলের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে সবজি ও দেশীয় ফলমূল রপ্তানি হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে বেশি রপ্তানি হয়। বিভিন্ন ধরনের কচু থেকে কচুলতি, কচুমুখী, ওলকচু, কচুর ফুল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, লাউ, আলু, মিষ্টিআলু, করলা, কাঁকরোল, পটল, ঝিঙে, শসা, শিম, লেবু, পেঁপে, জলপাই, কলার মোচা, কাঁচকলা, সাতকরা, শালগম, গাঁজর, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মূলাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি, ফলমূল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। মূলত বেশির ভাগ সবজি মৌসুমিভিত্তিক রপ্তানি করা হয়। আবার কিছু সবজি সারা বছর রপ্তানি করা হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এদেশের মৌসুমি ফল ও সবজির কদর বেশি। তবে এখন বিদেশিরাও বাংলাদেশের শাকসবজি ফলমূল খেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। গত বছর করোনা মহামারির প্রকোপে আকাশপথে সবজি রপ্তানি বন্ধ ছিল বলা যায়। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ৭০৪ টন সবজি রপ্তানি হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০৪৫ টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২০৯৬ টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২১১৫ টন সবজি রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। গত প্রায় একদশকে বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে সবজি ছাড়াও ফলমূল উত্পাদনে বড় ধরনের কৃষি বিপ্লব ঘটে গেছে। পেঁপে, আনারস, কাঁঠাল, আম, কমলা, মাল্টা, কলা, কাজুবাদামের মতো দামি ফলমূল ব্যাপকভাবে চাষ করা হচ্ছে এখন। এছাড়া বিভিন্ন জাতের মসলা, ড্রাগন ফল চাষেও অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন এখানকার কৃষকরা। সেখানে উত্পাদিত ফলমূল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি এখনো। এ জন্য সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে ফলমূল সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের যথোপযুক্ত অবকাঠামো ও কারখানা প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।