রিয়াদ হোসেন
স্থানীয় পর্যায়ে ভোগের জন্য আমদানিকৃত পণ্যের কাঁচামালে বন্ড সুবিধার বিদ্যমান শর্ত কঠোর করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর ফলে কোনো আমদানিকারক ও উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরকারের শুল্ককর দীর্ঘমেয়াদে বকেয়া রাখতে পারবে না। অন্যদিকে বন্ড সুবিধা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান কোনো আনিয়ম করলে আমদানির অনুমতিও পাবে না। এ ধরনের সাতটি শর্ত জারি করে এনবিআর সম্প্রতি নতুন আদেশ জারি করেছে। এর ফলে শুল্ক বিভাগের কোনো আদেশ চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গেলেও পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্ত শুল্ক বিভাগের হাতেই থাকবে।
দেশে বর্তমানে ভোগ্যপণ্য হিসেবে চিনি ও ভোজ্য তেল আমদানি করে তা পরিশোধন করে ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। এজন্য হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি রয়েছে। কোম্পানিগুলোর পরিচালন মূলধনের ওপর চাপ কমাতে আমদানিকৃত এসব ভোগ্যপণ্যে সরকার বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা দিয়ে থাকে। অর্থাত্ ছয় মাসের জন্য এসব পণ্য বিনা শুল্কে খালাস করে নির্দিষ্ট গুদামে রেখে তা দিয়ে উত্পাদিত পণ্য বিক্রি করে সরকারকে শুল্ককর পরিশোধ করতে পারে। ভোগ্যপণ্য বিবেচনায় কোম্পনিগুলোকে সরকার এ সুবিধা দিয়ে আসছে। যে পরিমাণ বাল্কে আনা অপরিশোধিত চিনি বা তেল (কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়) খালাস করা হয়, তা দিয়ে উত্পাদিত পণ্য বিক্রি করে ছয় মাসের মধ্যে শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ শুল্ককরের অর্থ শুরুতে পরিশোধ করতে হয় না বলে কোম্পানিগুলোর জন্য তা স্বস্তির।
তবে এই সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে সুকৌশলে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ। এনবিআর সূত্র জানায়, কেবল দেশবন্ধু সুগার মিলের কাছেই আটকে রয়েছে সরকারের ৯৪৫ কোটি টাকার শুল্ককর। বিভিন্ন সময়ে পণ্য আমদানি করে তা খালাস করলেও আইনি মারপ্যাঁচে গত পাঁচ বছর আগের অর্থও আটকে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কাছে। হোম কনজাম্পশনের বন্ড লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী, যে পরিমাণ কাঁচামাল বন্ড গুদাম থেকে উত্পাদনের জন্য ব্যবহার করা হবে, সে অনুযায়ী রাজস্ব পরিশোধযোগ্য। শুল্ক বিভাগের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিক্ষেত্রে শুল্ক বিভাগের আইনগত দাবিনামাকে অপ্রাসঙ্গিক অজুহাতে তর্কিত করে আদালতে নিয়ে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আটকে থাকায় সম্প্রতি দেশবন্ধু সুগার মিলের আমদানিকৃত চালান শুল্ক বিভাগ আটকে দেয়। যা নিয়ে জটিলতার তৈরি হয়।
এনবিআরের শুল্ক বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, মূলত এসব কারণে এনবিআর কিছু কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। এর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান এখন থেকে আর সরকারের রাজস্ব দীর্ঘসময় আটকে রাখতে পারবে না। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে শুল্ক বিভাগের ক্ষমতাও কিছুটা বেড়েছে।
এনবিআরের নতুন আদেশ অনুযায়ী, হোম কনজাম্পশন বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুমোদিত বার্ষিক বা সাময়িক আমদানি প্রাপ্যতার ভিত্তিতে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। বার্ষিক উত্পাদন ক্ষমতা, ওয়্যারহাউজের ধারণক্ষমতা, আগের বছরে কাঁচামালের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট কমিশনার প্রাপ্যতার পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। এটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক উত্পাদনক্ষমতার ৮০ শতাংশের বেশি হবে না। এছাড়া গুদাম থেকে কাঁচামাল অবৈধ অপসারণ, পরিমাণে অসঙ্গতি কিংবা এনবিআরের কোনো দাবিনামা অনিষ্পন্ন থাকলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমদানি প্রাপ্যতা দেওয়া হবে না। কোনো অনিষ্পন্ন দাবিনামা থাকলে পণ্যের শুল্ককরের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টির ভিত্তিতে কমিশনার পণ্য খালাসের আদেশ দিতে পারবেন। ঐ অর্থ পরিশোধ হলেই পরবর্তী চালান খালাস করা যাবে। এছাড়া প্রতিষ্ঠান দাবিনামার দায় স্বীকার করে প্রযোজ্য শুল্ককর, অর্থদণ্ড, সুদ ও বকেয়া পরিশোধের লক্ষ্যে কিস্তি সুবিধার আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট কমিশনার ঐ পাওনা পরিশোধের সর্বোচ্চ ছয় মাসের সমান মাসিক কিস্তি মঞ্জুর করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে সুদ পরিশোধ করতে হবে।