আমাদের বেদনাদায়ক নির্লিপ্ততা!

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বাড়িয়াই চলিয়াছে। প্রতিদিন আমাদের এমন সব বেদনাদায়ক ঘটনার মুখোমুখি হইতে হয়, যাহাতে আমাদের গা শিহরণ দিয়া উঠে। মন হইয়া পড়ে বিমর্ষ, বেদনাবিধূর ও হতাশায় ভারাক্রান্ত। হতাশা এই কারণে যে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন, লেখালেখি, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ইত্যাদি তো কম হইল না। কিন্তু রাস্তাঘাট কি নাগরিকদের জন্য নিরাপদ হইয়াছে? অনেক খড়কুটা পুড়াইয়া একটি আইন করা হইল। কিন্তু সেই আইন আজ কতটুকু বাস্তবায়িত হইয়াছে? ড্রাইভারদের জন্য সড়ক-মহাসড়কে বিশ্রামাগার তৈরিসহ সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেসব প্রতিশ্রুতি ও নির্দেশনা দিয়াছিলেন, তাহারও কি সবটাই আলোর মুখ দেখিয়াছে? সড়ক দুর্ঘটনার বহু কারণ রহিয়াছে। শুধু চালক, মালিক ও সরকারকেই দোষ দিলে চলিবে না। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও শুধু সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী নহে। আমাদের অসচেতনতাও বহুলাংশে দায়ী। চালকরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাইতেছে। আবার আমরাও বেপরোয়াভাবে রাস্তা পার হইতেছি। রোড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়া আমরা বহু লিখিলাম। কিন্তু ফল পাইলাম না। শহর ও গ্রামসহ সকল এলাকার সড়কে ঠিকমতো সাইন-সিম্বল দিয়া তাহা চালক, যাত্রী ও পথচারীদের মানিয়া চলিবার সংস্কৃতি আমরা আজও প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিলাম না। দুর্ঘটনার মতোই ইহাও কম বেদনাদায়ক নহে।

গত শুক্রবার ছুটির দিন রাজশাহীতে বাস-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হইয়া আগুনে পুড়িয়া মারা গিয়াছেন ১৭ মাইক্রোবাস যাত্রী। ইহাতে তিনটি পরিবারের স্বপ্ন-স্বাদ-আহ্লাদ মুহূর্তের মধ্যেই ধূলিসাত্ হইয়া গিয়াছে। কী মর্মান্তিক দৃশ্য! ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপানো দুমড়াইয়া মুচড়াইয়া যাওয়া সেই মাইক্রোবাসটির দিকে তাকানো যায় না। তিন তিনটি পরিবারে এখন চলিতেছে শুধু আহাজারি। সড়ক দুর্ঘটনায় এইদিন সারা দেশে আরো সাত জনের মৃত্যু হইয়াছে। রাজশাহীর ঘটনাটি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, একটি বাঁশবোঝাই ভ্যান ও এক কিশোর সাইকেল চালাইয়া আসিতেছিল। তাহাদের ওভারটেক করিতে গিয়া ঢাকা অভিমুখী হানিফ পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় মাইক্রোবাসের। তাহা আবার দাঁড়াইয়া থাকা একটি গ্যাসচালিত হিউম্যান হলারকে (সিএনজি) ধাক্কা দেয়। এই সময় সেই গ্যাস সিলিন্ডারটি বিস্ফোরিত হইলে মাইক্রোবাসে আগুন ধরিয়া যায় এবং তাহার যাত্রীরা ভিতরেই পুড়িয়া মারা যায়। একদিকে যত্রতত্র ওভারটেকিংয়ের কারণে দুর্ঘটনা বাড়িতেছে, অন্যদিকে যানবাহনে অপরিকল্পিতভাবে সিলিন্ডারের ব্যবহারের কারণে একেকটি যানবাহন আজ পরিণত হইয়াছে ভয়াবহ ভ্রাম্যমাণ বোমায়। কিছুদিন আগে রাজশাহীর দুর্গাপুরে আরেকটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে যাহার পিছনে দায়ী একটি শ্যালোচালিত নসিমন তথা ভটভটি। নসিমন-করিমন দেশি প্রযুক্তির তৈরি যানবাহন যাহা আমাদের অর্থনীতির জন্য সাশ্রয়মূলক। কিন্তু ইহাকে নিরাপদ যানবাহন হিসাবে গড়িয়া তুলিতে সরকার কি কোনো উদ্যোগ নিতে পারে না? শ্যালো মেশিনের পরিবর্তে সংযুক্ত হইতে পারে না উন্নত প্রযুক্তি?

থাইল্যান্ড ২০১১ সালে ঘোষণা দিয়াছিল, তাহারা ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার হার অর্ধেকে নামাইয়া আনিবে। ইতিমধ্যেই তাহারা এই কাজে সফল হইয়াছে। কিন্তু আমরা পারিতেছি না কেন? আমরা মনে করি, দেশে সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা সংযুক্ত থাকিলেও দুর্ঘটনা রোধের ব্যাপারে আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়ের অভাব রহিয়াছে। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ব্যাপকতা আমাদের মর্মাহত করে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে প্রতি বত্সর সড়ক পথে অন্তত ৫ হাজার দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। ইহাতে মারা যাইতেছে কমপক্ষে ৪ হাজার মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণকারীর সংখ্যা ইহার চাইতে দ্বিগুণ। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। অতএব, সর্বনাশা সড়ক দুর্ঘটনার হার কমাইতে সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন, পথচারী-যাত্রী, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।