অনলাইন আসক্তি তরুণদের মেধার প্রতিবন্ধক

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। আর এই প্রবাদের ব্যাখ্যা হলো—আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত্, অর্থাত্ আজকে যিনি তরুণ তারা একদিন রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবে। মানুষের জীবনের চারটি কাল রয়েছে—শিশু, কিশোর, যুবক ও বার্ধক্য কাল। আর এই চারটি কালের মধ্যে সমাজ এবং দেশকে নিয়ে চিন্তার মোক্ষম সময় হলো—কিশোর এবং যুবক অবস্থায়। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশের সৃজনশীলতামূলক কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি জড়িত থাকে তরুণরা। আর এসব সৃজনশীলমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দেশকে বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক স্থানে অধিষ্ঠিত করে। এখন যদি এই তরুণরা সৃজনশীলমূলক কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের ম্যানপাওয়ারের কাঠামো কেমন হতে পারে, তা একবার ভেবে দেখতে পারেন।  আমরা জানি, বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। এ যুগের মানুষদের নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় কাজ প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। বিশ্বের প্রায় ২৭০ কোটিরও অধিক মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। আর এই বিশাল জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দিনের অধিকাংশ সময় এর পেছনে ব্যয় করে। একটি পরিসংখ্যান ২০১৬ সালে প্রকাশ পেয়েছিল। যেখানে দেখানো হয়েছে—একজন মানুষ দিনে অন্তত ২ হাজার ৬৬৪ বার তার নিজের মোবাইল ফোনের স্ক্রিন স্পর্শ করে। আর এই স্ক্রিন স্পর্শ করার কারণ হলো—তারা তাদের ফোনের নোটিফিকেশন চেক করে এবং কোনো এসএমএস এলো কি না, ইত্যাদির দিকে মনোনিবেশ করে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কীভাবে তরুণরা আসক্তির চরম সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে, তা কিছু পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আলোচনা করা যাক। বর্তমানে যারা দ্রুত ইন্টারনেটে আসক্ত হচ্ছে তাদের বয়স ১৪ থেকে ২৪ বছর, অর্থাত্ তরুণসমাজ। এবং এদের মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত, এবং পৃথিবীতে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ ভিডিও গেম খেলে। বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটি ২৭ লাখ, যাদের মধ্যে ১০ কোটি ৩২ লাখ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত। আর এই বিশাল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ। আর বাংলাদেশ প্রতিদিন শুধু পাবজি নামক ভিডিও গেম খেলে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। এসব ভিডিও গেম খেলার ফলে তাদের মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। কারণ এসব গেমে সাধারণত গোলাবারুদ ব্যবহার করার মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যার ফলে যখন তারা গেমে  পরাজিত হয় তখন তাদের মন এবং মেজাজ খিটখিটে হয়, অল্প কথায় একে অপরের সঙ্গে রাগারাগি করে। এছাড়াও এসব গেমে বিভিন্ন ধাপ থাকে যেসব ধাপ অতিক্রম করতে পারলে অনেক রকম সুবিধা প্রদান করা হয়। আর এসব ধাপ অতিক্রম করার জন্য যারা গেম খেলে তারা একটানা দীর্ঘ সময় এসব গেমের পেছনে ব্যয় করে। তাছাড়াও বর্তমানে এক বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়গুলো এসবের পেছনে ব্যয় করছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের উচিত ছিল এই সময়গুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা। শিক্ষার্থীরা যদি এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারনেটের সময় পার করে তাহলে ভবিষ্যতে দেখা যাবে জাতি এক মেধাশূন্যতায় ভুগছে।  অনলাইন দুনিয়ার করাল গ্রাস থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিশু এবং কিশোর যাদের প্রায় ১৯ শতাংশ ভিডিও গেম এবং ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে সন্তানের সঙ্গে সময় দিতে হবে। কারণ দেখা যায়—বর্তমানে পিতা-মাতা দুজনে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার ফলে তাদের সন্তানরা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে এবং এই নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনলাইনকে তারা সঙ্গ হিসেবে বেছে নেয়। তাই পিতা-মাতাদের উচিত—সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করে এই অনলাইনের করাল গ্রাস থেকে তাদের রক্ষা করে মেধা বিকাশে সাহায্য করা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়