মানুষের তৈরি ব্যস্ততম সুয়েজ খাল আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে সংযুক্ত করেছে। ১৫০ বছরেরও বেশি পুরনো সুয়েজ খাল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট। এটিকে বিশ্ববাণিজ্যের ধমনিও বলা হয়। মালবাহী জাহাজ ‘এভার গিভেন’ আটকে যাওয়ায় গতকাল পর্যন্ত ৩০০-র বেশি জাহাজ আটকে পড়েছে। গত ২৩ মার্চ এই ঘটনা ঘটে।
পানামায় নিবন্ধনকৃত ‘এভার গিভেন’ জাহাজটি চীন থেকে নেদারল্যান্ডে পণ্য পরিবহন করছিল। তাইওয়ানের কোম্পানি এভারগ্রিন মেরিন জাহাজটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এর দৈর্ঘ্য পাঁচটি ফুটবল মাঠের সমান যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মালবাহী জাহাজের একটি। ২ লাখ টনের এই জাহাজে একসঙ্গে ২০ হাজার কনটেইনার পরিবহন করা যায়। জাহাজটি ৪০০ মিটার লম্বা এবং ৫৯ মিটার চওড়া। আটকে পড়া জাহাজের মধ্যে মালবাহী ও তেলবাহী জাহাজ রয়েছে। এসব মালবাহী জাহাজে যেসব পণ্য রয়েছে তার মধ্যে আছে কাপড়, আসবাবপত্র, উৎপাদনের উপকরণ ও গাড়ির যন্ত্রাংশ।
বাণিজ্যের সহজ রাস্তা
উত্তরে ভূমধ্যসাগর থেকে দক্ষিণে লোহিতসাগরের সংযোগরক্ষাকারী খাল। জলপথে ইউরোপ থেকে এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ব্যবস্থা সহজতর করে তুলেছে এই খাল। এই খালের ফলে উত্তর আটলান্টিক থেকে ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরের মধ্যে দিয়েই অনেক কম সময়েই ভারত মহাসাগরে এসে পড়ে বাণিজ্য জাহাজগুলো। সুয়েজ খাল তৈরির আগে আফ্রিকা মহাদেশ বরাবর ঘুরে আসতে জাহাজগুলোকে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পথ বেশি পাড়ি দিতে হতো। সময় লাগত ৮ থেকে ১০ দিন। এখন সেখানে একদিনেই পেরিয়ে যাওয়া যায় সুয়েজ খালের মাধ্যমে। সুয়েজ খালের দৈর্ঘ্য মাত্র ১৯৩ কিলোমিটার। এর উত্তরে ভূমধ্যসাগর এবং দক্ষিণে লোহিত সাগরের জলতল সমান হওয়ায় পানামা খালের মতো আলাদা করে জাহাজ পারাপারের জন্য লক ব্যবস্থা করার প্রয়োজন পড়েনি। ফলে পানামা খালের চেয়ে অনেক সহজেই জাহাজ যাতায়াত করতে পারে এই খালে।
কেন বিশ্বের মাথাব্যথা
খুব দ্রুত সুয়েজ খালের রাস্তা ফাঁকা না করা গেলে বিশ্ব জুড়ে বাণিজ্যে বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। যার প্রভাব পড়তে পারে মধ্যবিত্তের পকেটে। মিশরের সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত কৃত্রিম খাল। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে হয়ে থাকে। এই খাল দিয়েই ১২ শতাংশ বাণিজ্য হয়। সারা বিশ্বের জলপথে বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ শিপিং কনটেইনার এই খাল দিয়েই যাতায়াত করে। ২০১৯ সালে এই খাল দিয়ে ১৯ হাজার জাহাজে ১২০ কোটি টন পণ্য পরিবহন করা হয়। যা ঐ বছর সমুদ্রপথে বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় আট ভাগের এক ভাগ। গত বছর এসসিএ জানিয়েছিল, ২০২০ সালে প্রায় ১৯ হাজার জাহাজ বা প্রতিদিন গড়ে ৫১ দশমিক পাঁচটি জাহাজ সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচল করেছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও চীনের বহু উত্পাদক প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যবাহী জাহাজ এই খাল দিয়ে ইউরোপে পাঠায়। আর মধ্যপ্রাচ্যের তেলবাহী জাহাজ ইউরোপে পাঠাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধ বা শান্তি যে কোনও সময় যে কোনও দেশের জাহাজ সুয়েজ খাল ব্যবহার করতে পারবে।
লয়েডস লিস্ট জানায়, এ খালের পশ্চিম দিক দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫১০ কোটি ডলার ও পূর্ব দিক দিয়ে প্রতিদিন ৪৫০ কোটি ডলারের পণ্য পরিবহন করা হয়। লয়েডস লিস্ট জানায়, জাহাজটির দুই দিকে ১৬০টিরও বেশি জাহাজ আছে যার মধ্যে ৪১টি মালবাহী ও ২৪টি তেলবাহী জাহাজ রয়েছে। এই খাল দিয়ে সবচেয়ে বেশি মাল রফতানি করে রাশিয়া এবং সৌদি আরব। ভারত এবং চীন সবচেয়ে বেশি মাল আমদানি করে এই পথ দিয়ে। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার যোগাযোগের নাভিমূল নামে খ্যাত সুয়েজ খাল। এই জলপথটিতে তিনটি প্রাকৃতিক হ্রদ আছে। সুয়েজ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হলো পানামা খাল, পারস্য উপসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগর। বিবিসি জানায়, প্রতিদিন ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। আটকে থাকা পণ্যের দাম দিনের হিসেবে বাড়ে।
সরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত
এভার গিভেন নামে ঐ জাহাজটিকে সরানোর কাজে হাত লাগিয়েছে মিশরের প্রশাসন। অন্যদিকে বিশাল জাহাজের সামনে হলুদ রঙের ক্ষুদ্র এক্সকাভেটরের ছবি নিয়ে কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় মজা করে লিখেছেন যে বিশালাকার জাহাজের সামনে ছোট এক্সকাভেটরকে খেলনা বলে মনে হচ্ছে। সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রবিবার (গতকাল) সন্ধ্যা নাগাদ জাহাজটি চালিয়ে নেওয়ার মত সুবিধাজনক পর্যায়ে আবার ভাসানো যেতে পারে বলে তারা আশা করছেন। আটকে থাকা এভার গিভেন জাহাজটিকে সরাতে শনিবার প্রায় ২০ হাজার টন বালু সরানো হয়। ১৪টি টাগবোট টানাটানি করে বালুচর থেকে এভার গিভেনকে নড়ানোর চেষ্টা করে। তবে শক্তিশালী স্রোত আর বাতাসে উদ্ধার চেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়। টাগবোটগুলো জাহাজটিকে দুদিকে ৩০ ডিগ্রি সরাতে সক্ষম হয়। বিশেষজ্ঞদের বরাতে বিবিসি জানায়, পূর্ণ জোয়ারের সময় জাহাজটিকে আড়াআড়ি অবস্থান থেকে সোজা করা না গেলে মাল নামিয়ে তা করতে হবে। এতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।
দীর্ঘ ইতিহাসের খাল
১৮৫৯ সাল থেকে ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত লাগাতার পরিশ্রমে তৈরি হয়েছিল এই খাল। ১৮৬৯ সালের ১৭ নভেম্বর এর আনুষ্ঠানিক সূচনা। মিশরের সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষ এই সুয়েজ খালের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। তবে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এই খালের ওপর আধিপত্য বজায় রেখেছিল ফ্রান্স এবং ব্রিটেন। ১৯৫৬ সালের পর তা পুরোপুরি মিশর সরকারের অধীন হয়। ২০১৪ সালে মিশর সরকার খালটির প্রস্থ আরো বাড়ানোর কাজ শুরু করে যাতে এর ধারণক্ষমতা দৈনিক ৪৯টি জাহাজ যাতায়াতের থেকে বেড়ে হয় ৯৭টি। এর জন্য খালটির প্রস্থ আরো ৩৫ মিটার বাড়ানো হয়। এই প্রকল্পের আনুমানিক খরচ হয় ৫ হাজার ৯৪০ কোটি মিশরীয় পাউন্ড। ২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন সুয়েজ খাল চালু হয়। এটা আসলে বাইপাস। এর ফলে খালের চাপ খুব বেড়ে গেলে কিছু কিছু জাহাজ বাইপাস দিয়েও পার করানো হয়।
ইত্তেফাক/এএইচপি