অণুগল্প

বেনারশি

 

বাদল চিরদিনই ল্যাদাই মার্কা। পড়াশোনায় মাঝারি ছিল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি কলেজ থেকে ইতিহাসে অনার্স, মাস্টার্স করেছে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এনজিওতে মাইক্রো ক্রেডিট সেকশনে একটা চাকরি জুগিয়েছে। ছোটবেলায় খেলার মাঠে সবাই যেমন ওকে কাটিয়ে গোল দিত তেমনি কর্মক্ষেত্রেও সবাই ওকে টপকিয়ে ওপরের ধাপে উঠে গেছে, ও আঠারো বছর ধরে ফিল্ডেই রয়ে গেছে। এজন্য ঘরের বউ নিশিও কম কথা  শোনায় না ওকে।

নিশি কেরানিবাপের উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়ে। বাবা তার সাধ্যের মধ্যে শ্যামলা গোলগাল চেহারার মেয়ের জন্য বাদলের মতো পাত্র পাওয়াটাকেই সৌভাগ্য মনে করেছিলেন। কিন্তু তার এই ভুল ধারণার খেসারত বাদলকেই গুনতে হচ্ছে কড়ায়গণ্ডায়। নিশির সবচাইতে ছোট বোন নিলিমার বিয়ে পরশু। শ্যালিকার বিয়ে—ভালো গিফট না দিলেই নয়।

সে ব্যবস্থা বাদল করেছে অবশ্য, তবে গোল বাধল নিশির শাড়ি নিয়ে। নিশি যখন বলল বোনের বিয়েতে পরার জন্য তার নতুন শাড়ি চাই। বাদলের মরার উপর খাড়ার ঘা মনে হলেও সর্ষে ফুল জমিনে সবুজ পাড়ের একটা ঢাকাই জামদানি কিনেই ফেলল। হাজার হোক শ্বশুরবাড়িতে তারও তো একটা সম্মান আছে। অন্য আত্মীয়স্বজনদের কাছে নিশি যেন ম্লান না হয়ে যায়। কিন্তু বৃহস্পতিবার অফিস করে দিনাজপুর থেকে সে যখন রংপুরে বাসায় পৌঁছাল তখন রাত দশটা। প্যাকেট খুলে শাড়ি বের করে নিশির মুখ ঝপ করে কালো হয়ে গেল। বাদলের মুখ শুকিয়ে গেল আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাসে। হাতমুখ ধুয়ে দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে খেতে বসল। নিশি মুখ ভার করে ভাত বেড়ে দিল চুপচাপ। রাতে বিছানায় মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে থাকল নিশি। বাদল ওর পিঠে হাত রাখতেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। তারপর বরাবরের মতো বাদলের অদক্ষতা, গেঁয়ো স্বভাব, সেকেলে রুচি এসব নিয়ে রীতিমতো কথার তাণ্ডব বয়ে গেল। যার সারমর্ম করলে দাঁড়ায় নিশি বোনদের সঙ্গে নেট ঘেঁটে একটা বেনারশি শাড়ি পছন্দ করেছে সেটা তার চাই, নইলে বিয়েবাড়িতে তার মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না।

বাদল কারো সঙ্গেই কথায় পেড়ে ওঠে না কোনোদিন। আর বউয়ের কথার ঝাঁজকে তো বাঘের চেয়েও বেশি ভয় করে। আজ শুক্রবার, সুপার মার্কেট বন্ধ। অগত্যা সকাল সকাল বাদল মহিপুর বেনারশি পল্লিতে এসে হাজির হলো। উজ্জ্বল রানি কালারের ওপর জড়ির কাজ করা বেনারশি শাড়িটা চল্লিশ পেরুনো শ্যামলা, মোটাসোটা নিশির শরীরের কেমন মানাবে বাদল ঠিক ঠাওর করতে না পারলেও বাড়তি কড়কড়ে দশ হাজার টাকার ঘাটতি পূরণে তার সামনের মাসের ঠেলাটা ঠিকই আন্দাজ করতে পারল। শুক্রবার হওয়াতে এদিক থেকে অটো রিকশা তেমন যাচ্ছে না। আবার দুপুরের পরই শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা। একটা অটো হাত দেখিয়ে থামাতে পারলেও ওকে টপকিয়ে আরেকজন উঠে পড়ল। একটাই সিট ফাঁকা ছিল ওটায়।

বাদল আর রিস্ক নিল না। একটা রিকশায় উঠে বসল। অন্তত বুড়িরহাট পর্যন্ত যেতে পারলে অটো পেয়ে যাবে। বাদলের একটা অভ্যাস রিকশা বা অটোতে উঠলে চালকের সঙ্গে গল্প করা। আসলে বাড়িতে, অফিসে কোথাও ওর কথা শোনার লোক নেই, তাই এরকম লোকজনের সঙ্গেই একটু কথাবার্তা বলে সাধ মেটায়। রিকশাচালক বেশ বয়স্ক, প্যাডেল ঘোরাতে কষ্টে কুঁকড়ে যাচ্ছে পেট পিঠ। চাচা ডেকেই শুরু করল আলাপ। কথায় কথায় জানা গেল একটা ছেলে বিয়ে করে আলাদা খায়, বাপের ধার ধারে না। মা মরা মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। যৌতুক হিসেবে একটা অটোরিকশা দিতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে আর কিছু ধারকর্জ করে সেই টাকা জোগাড় করেছে। এখনো বিয়ের অন্যান্য খরচ করার টাকা জোগাড় হয়নি। কিস্তি দেয়া ঋণ পরিশোধ এসব তো পরের কথা! হয়তো না মরা পর্যন্ত এভাবেই রিকশা টেনে যেতে হবে তাকে। এখন অটো রিকশা হওয়াতে সহজে কেউ রিকশায় উঠতে চায় না। বাদল বুড়ির হাটে নামল না। কথায় কথায় বাসার সামনে পৌঁছে গেল ওরা। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে বাসার দরজায় নক করতে গিয়ে কী মনে করে থেমে গেল বাদল। ঘুরে দেখল বেল দিতে দিতে বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা চলে যাচ্ছে।

‘চাচা ও চাচা...’ বলে ডাকতে ডাকতে জোর কদমে হেঁটে এগিয়ে গেল বাদল। বৃদ্ধ অবাক হয়ে পেছনে ফিরে দেখল সিটে কিছু ফেলে গেছে নাকি প্যাসেঞ্জার! ততক্ষণে বাদল পৌঁছে গেছে রিকশার কাছে। রিকশাওয়ালাকে আরো অবাক করে হাতের প্যাকেটটা ধরিয়ে দেয় বাদল। বলে, ‘আপনার মেয়ের বিয়েতে এই ভাইয়ের পক্ষ থেকে সামান্য উপহার।’

রিকশাওয়ালার হা হয়ে যাওয়া মুখ বন্ধ হওয়ার আগেই বাদল ঘুরে দরজার কাছে পৌঁছে যায়। তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে দরজায় নক করে।

অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য