পেনশনারের বিবাহ প্রসঙ্গ

বিবাহ মানুষ কখন করে, কেন করে—এসব সবারই সুবিদিত। বিবাহ শুধু জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্য নয়—অনেক সময় নিঃসঙ্গ মানুষের সঙ্গ লাভের জন্যও বিবাহ হয়ে থাকে—তাও সবার জানা। সাধারণত আমাদের দেশে পুরুষের বিবাহ হয়ে থাকে ২১ থেকে ৩০-৩৫ বছর বয়সে আর মেয়েদের আইনত ১৮ থেকে ২৮ বছরে, বাস্তবে আরো কম বয়সে; কিন্তু নিঃসঙ্গতা মেটানোর বিবাহে পাত্রপাত্রীর বয়সের কোনো গাছপাথর থাকে না। তা হতে পারে এমনকি ৬০-৮০ বছরের কোনো পুরুষের ক্ষেত্রে, এমনকি নারীরও।

ধর্মে বিবাহের বৈধতার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। আমাদের দেশের প্রচলিত সামাজিক বিধান, আইনকানুন অনুসারে কোনো নারী একসঙ্গে দুই জন স্বামী রাখতে পারেন না, আর একজন পুরুষ প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারেন না। আইনানুগ বৈধ বিবাহের ফলে স্ত্রী বা স্বামীর স্পাউজ অর্থাত্ স্বামী বা স্ত্রীর সম্পত্তির ওপর মালিকানাও বর্তায়। এটি ধর্মীয় বিধান।

বাংলাদেশে এখন প্রায় ৭ লাখ পেনশনভোগী আছেন। কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও যদি ধরে নেওয়া যায় যে, এইসব পেনশনভোগীর ৫ শতাংশ বিধবা বা বিপত্নীক, তাহলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার। এই সংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও কয়েক হাজার নারী-পুরুষ সন্তানদের লালন, নিজের দেখাশুনা—নানান কারণে পুনর্বিবাহ করতে বাধ্য হন।

সব মানুষই যে ৫৯ বছর বয়সে যাওয়ার পরে অবসরে যেয়ে পেনশন পান তা  নয়। অনেকেই চাকরিজীবী স্বামী বা স্ত্রীকে অকালে হারিয়ে পারিবারিক পেনশন পেয়ে থাকেন। অনেকেরই হয়তো মনে আছে কয়েক বছর আগে এক বছরের কম বয়সি এক মেয়েশিশু রেখে বখাটেদের মটরসাইকেলে চাপা পড়ে মারা গিয়েছিলেন রুনা নামের এক তরুণী সরকারি কর্মচারী। সেই তরুণীর স্বামী এখন  পারিবারিক পেনশন পান। শিশুটি এখনো বছর পাঁচ-ছয়েকের।

আগে বিধান ছিল—পুরুষ কর্মচারী মৃত্যুবরণ করলে তার বিধবা স্ত্রী আমৃত্যু পেনশন পাবেন; কিন্তু মহিলা কর্মচারীর মৃত্যু ঘটলে স্বামী পাবেন ১৫ বছর পেনশন। এই পেনশনের নাম পারিবারিক পেনশন। এটা নারী নাকি পুরুষ—কার প্রতি ছিল আক্রোশ! শেষাবধি ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর অর্থ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এই বৈষম্য দূর করা হয়েছে। এখন নারী বা পুরুষ উভয় ধরনেরই সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুর পরে বিপত্নীক স্বামী বা বিধবা পত্নী আমৃত্যু পারিবারিক পেনশন পাবেন যদি না পুনর্বিবাহ করেন।

ওপরে উল্লিখিত রুনার স্বামীর যদি ইতিমধ্যে চাকরি জোগাড় না হয় তাহলে তার আয়ের উত্স পারিবারিক পেনশন। এখন তিনি যদি শিশু কন্যাটিকে লালনপালন করার জন্য বিবাহ করেন তবে পেনশন বন্ধ। বাবা বিবাহ করলে কন্যাটি তখন পেনশন পাবে প্রচলিত বিধানানুসারে তার মায়ের মৃত্যুর পরের ১৫ বছর। অর্থাত্ মেয়েটির যখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর উপযুক্ত সময় আসন্ন তখনই বন্ধ হবে মায়ের মৃত্যুজনিত পেনশন। তাহলে এই পেনশন অব্যাহত রাখতে হলে রুনার স্বামীকে বিবাহ নয়—যেতে হবে কোনো অবৈধ সম্পর্কে।

পেনশনারের বিবাহ নিয়ে রাষ্ট্র কদিন আগে হঠাত্ করে রক্তচক্ষু হয়ে উঠেছে। পেনশন চালু হওয়ার পর থেকেই পেনশনার নিজে বিবাহ করলে পেনশনারের মৃত্যুর পরে স্পাউজ পেনশন পেতেন। ফলে পেনশনার পেনশন পাওয়া অবস্থায় স্বামী বা স্ত্রী বিয়োগের ফলে নিজের দেখাশুনা বা সন্তানদের লালনপালনের জন্য বিবেচনামতো বিবাহ করতেন। পত্রিকান্তরে জানা গেছে সম্প্রতি অর্থ বিভাগ পেনশন স্পষ্টীকরণের নামে মহাহিসাব নিয়ন্ত্রককে জানিয়েছে, পেনশন পাওয়া অবস্থায় কোনো পেনশনার বিবাহ করলে পেনশনারের মৃত্যুর পরে এই বিবাহজাত স্বামী বা স্ত্রী পেনশন পাবেন না। সিদ্ধান্তটি ধর্ম ও সামাজিক আচরণের বিপরীত।

পারিবারিক পেনশনভোগী বিবাহ করলে পেনশন পাবেন না, পেনশনার বিবাহ করলে তার মৃত্যুর পরে স্পাউজ পেনশন পাবেন না—এই আদেশসমূহ বহাল/জারি করে রাষ্ট্র কি বয়স্ক মানুষের বিবাহ নিরুত্সাহিত করছে না? দেশে প্রচলিত ধর্মমতে এটি সমর্থন করে না।

পারিবারিক পেনশন না পাওয়ার ভয়ে অনেক নারী-পুরুষই পুনর্বিবাহ না করে মানবেতর জীবনযাপন করেন। পারিবারিক পেনশনভোগী বিবাহ করলে রাষ্ট্রের কী ক্ষতি? বরঞ্চ রাষ্ট্র তৃপ্ত হতে পারে যে, পারিবারিক পেনশনভোগী বিবাহ করলে অন্য একজন নারী বা পুরুষ নিরাপত্তা পেল। নাগরিকের নিরাপত্তা দেখার দায়ভার তো রাষ্ট্রেরই। ঠিক তেমনি একজন পেনশনার বিবাহ করলেও অন্য একজন নারী বা পুরুষ নিরাপদ আশ্রয় লাভ করেন।

অবসরে যাওয়ার পরে স্ত্রী বা স্বামীর মৃত্যুজনিত কারণে বিবাহ করলে রাষ্ট্রের চোখে তা হঠাত্ দৃষ্টিকটূ হয়ে উঠল। হয়তো পেনশনারের সন্তানসন্ততি নেই-ই, বা থাকলেও আছে বিদেশে কিংবা দেশে থাকলেও পিতা-মাতার কাছে থাকার উপায় নেই—এই অবস্থায় একজন অসহায় পেনশনার কী করবেন? তিনি কি বৃদ্ধাশ্রমে যেয়ে উঠবেন, নাকি উঠবেন সেইসব আমলাদের বাড়িতে যারা এই তুঘলকি আদেশ দিলেন? 

রাষ্ট্র হয়তো অজুহাত দিতে পারে, পেনশনার কোনো একজন অল্প বয়সিকে বিবাহ করে রাষ্ট্রকে অনেক বেশি দিন পেনশন প্রদানের দায় চাপিয়ে দেয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিকল্প অন্য কোনো পথ বের করা যেতে পারত। যেমন হতে পারে—পেনশনার বিবাহ করলে স্পাউজের বয়স পেনশনারের থেকে কম বা বেশি ১০ বছরের মধ্যে হতে হবে। পেনশনারের মৃত্যুর পরে বিবাহিত স্বামী বা স্ত্রী পেনশনারের প্রাপ্য পেনশনের ৫০ শতাংশ পেতে পারেন এবং তা সর্বোচ্চ ১৫ বছর পেতে পারবেন। পেনশনে যাওয়ার পর বিবাহ মানেই ৬০ বছর বয়সের ওপরে বিবাহ এবং স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের ব্যবধান সর্বোচ্চ ১০ বছর হলে সন্তান লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই এই বিবাহজাত সন্তানদের পেনশন নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করার কোনো অবকাশও থাকবে না।   

ধর্ম এবং দেশাচার মেনে পারিবারিক পেনশনভোগী ও পেনশনারগণের  বিবাহের  ওপর  রাষ্ট্রের বারণ উঠে যাক। আর ১০টা সাধারণ মানুষের মতো পেনশনভোগীগণও পারিবারিক জীবন উপভোগ করুক। পারিবারিক পেনশনভোগী বিবাহ করলেও তার পেনশন অব্যাহত থাকুক। পেনশনার তার স্ত্রী বা স্বামীর অবর্তমানে পুনর্বিবাহ করলেও পেনশনারের মৃত্যুর পরে পরবর্তী সময়ে বিবাহিত স্ত্রী বা স্বামীকে শর্ত সাপেক্ষে পেনশনের আওতাভুক্ত রাখা হোক। পেনশনারের বিবাহের ওপর রাষ্ট্রের রোষকষায়িত নজরটি নরম হোক।

n লেখক :সাবেক অতিরিক্ত সচিব