মহাতারকারা যখন আপনার অপেক্ষায়!

রোদে পুড়ে, জ্যাম কাটিয়ে উঠে অবশেষে পৌঁছালাম বিখ্যাত মানুষদের দোরগোড়ায়। বিখ্যাত মানুষদের সান্নিধ্য পেতে চান সবাই। কিন্তু সেই সৌভাগ্য সবার হয় না। এই অপূর্ণতা পূরণেই মূলত এতটা জ্যাম ডিঙিয়ে আসা।

দরজা ঠেলে ঢুকতেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাত্। ছোটবেলায় তার লেখা আর ছবি দেখে বড় হয়েছি। অথচ তিনি এখন আমার সামনে! আগের মতোই আছেন, একটুও বদলাননি! কাব্য চর্চা করছেন খুব মনোযোগ দিয়ে। তাই তাকে আর বিরক্ত না করেই এগিয়ে গেলাম সামনে। ক্ষুদিরাম বসু দাঁড়িয়ে ফাঁসির মঞ্চে। কি ভীষণ সাহসী মানুষ তিনি। ১৮ বছরের এক তরতাজা যুবক, ফাঁসির দড়িও যেন তার কাছে তুচ্ছ! এই রুমেই বন্দি কাজী নজরুল ইসলাম। আমাদের জাতীয় কবির কারাবন্দির গল্পটা তো সবারই জানা!

ভীষণ সাহসী এই তিন বিখ্যাত মানুষের সাক্ষাত্ শেষে আরেক রুমে প্রবেশ! ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাত্। ঠিক তার বিপরীতে দাঁড়ানো এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প! কয়েকদিন আগে ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে পড়লাম, এই মানুষটা গত ৩ বছরে গড়ে দৈনিক ১৫টি মিথ্যে কথা বলেছেন! দিনে এত মিথ্যে ও কৌতুক একজন মানুষ কিভাবে বলতে পারে সেটা ট্রাম্পের চেয়ে ভালো আর কে জানে! বিশ্বের এই দুই ক্ষমতাধর ব্যক্তির ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা ও বাংলাদেশের প্রধানমমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এই যাত্রায় সাক্ষাত্ শেষ করে বিষয়টা একটু খোলাসা করা দরকার! খ্যাতিমানদের সাক্ষাত্ পাওয়া মোটেও সহজ নয়। এক বাড়িতে গেলেন আর সব বিখ্যাত মানুষের সাক্ষাত্ পেয়ে গেলেন, এটাতো ভুলেও কারো ভাবনায় আসে না। তাছাড়া অনেকে আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাই সেক্ষেত্রেও তাদের সাক্ষাত্ পাওয়া তো একেবারেই সম্ভব নয়। কিন্তু এই অপূর্ণতা পূরণে বিশ্বে তৈরি হয়েছে ওয়াক্স মিউজিয়াম বা ‘মোমেম জাদুঘর’। লন্ডনের মাদাম তুসো এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত। বাংলাদেশেও ছোট পরিসরে চালু হয়েছে ‘সেলিব্রেটি গ্যালারি’। এখানেই এক ছাদের নিচে মিলতে অনেক বিখ্যাত মানুষের ভাস্কর্যের সাক্ষাত্। অনেকেই এটাকে ‘বাংলাদেশের মাদাম তুসো মিউজিয়াম’ বলছেন।

লন্ডনের মাদাম তুসো মিউজিয়ামের অনুপ্রেরণা নিয়ে খ্যাতিমান ভাস্কর মৃণাল হক রাজধানীর গুলশান ১-এর ২নং রোডের ৫/এ বাড়িতে চালু করেছেন এমনই এক ব্যতিক্রমী সেলিব্রেটি ভাস্কর্য গ্যালারি। যেখানে এই মুহূর্তে স্থান পেয়েছে দেশি-বিদেশি ৩২ জন বিখ্যাত ব্যক্তির ভাস্কর্য। ভাস্কর্যগুলো দেখতে প্রতিনিয়ত ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। সংবাদপত্রে খবর পড়ে মোমে গড়া বিখ্যাতদের দেখতে এসেছেন ইশরাত জাহান। রাজধানীর একটি কলেজ পড়ুয়া এই তরুণী বলেন, ‘এটা অনেক ভালো একটি উদ্যোগ। বিশেষ করে আমরা যারা মাদাম তুসো মিউজিয়াম দেখিনি তাদের জন্য অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো!’

এখানে যে ভাস্কর্যগুলো স্থান পাবে সবগুলো মোমেম নয়, ফাইভার গ্লাসের তৈরি। ওপরে উল্লেখিত ৬ গুণী ছাড়াও রয়েছে সাদা পোশাকে মানবতার দূত মাদার তেরেসা, রাইফেল কাঁধে বিপ্লবী চে গুয়েভারা, গানের মঞ্চে পপ কিং মাইকেল জ্যাকসন, খ্যাতিমান অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন, মি বিন খ্যাত রোয়ান অ্যাটকিনসন, পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ানের ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো, বলিউড তারকা শাহরুখ খান, বিখ্যাত কমেডি সিরিজ থ্রি স্টুজেস-এর তিন খ্যতিমান চরিত্রসহ মোট ৩২ জন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।

বেশিরভাগ ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে অবিকল বাস্তবের সেই মানুষটির সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতি পাওয়া যায়। যেমন একটি টেবিলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পাণ্ডুলিপি পাঠরত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকরাউন্ডে গান বেজে ওঠে ‘কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল কর রে লোপাট... রক্ত-জমাট শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী!’ মুহূর্তেই যেন চলে যেতে হয় নজরুলের সৃষ্টি জগতে। আপনি যার সামনেই দাঁড়াবেন আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে ওই ব্যক্তির সৃজনশীল ও কর্মবহুল দুনিয়া।

প্রায় সবগুলো ভাস্কর্য দেখা শেষ করলেন তানিয়া আলম। ছবিও তুলেছেন নিজের ইচ্ছেমতো। কেমন লেগেছে আপনার কাছে? প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেই এই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ার উত্তর, ‘এমন ভাস্কর্য গ্যালারি করার মতো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি দুঃসাহসিক কাজ। আমার কাছে এই উদ্যোগটা বেশ ভালো লেগেছে। তবে আরো ভালোভাবে করা যেত এটা। যেমন লিওনেল মেসি, শাকিরা, শাহরুখ খানের ভাস্কর্যগুলো দেখে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল এটা যে তারা। আবার অনেকগুলো ভাস্কর্য অনেক বেশি ভালো হয়েছে। যেমন নরেন্দ্র মোদীর ভাস্কর্যটি।’

প্রায় ৭ মাস সময় লেগেছে এই গ্যালারি নির্মাণে। শুরুটা ৩৭টি ভাস্কর্য নিয়ে হলেও প্রথমদিকে প্রদর্শিত হবে ৩২ জন ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি। সপ্তাহের ৭ দিনই খোলা থাকবে সেলিব্রেটি গ্যালারি। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। গ্যালারিটির উদ্যোক্তা ভাস্কর মৃণাল হক বলেন, ‘আমি আমার দেশ, সংস্কৃতিকে তুলে ধরছি ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে। সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করছি এগুলো ভাস্কর্য, মূর্তি নয়। আমাদের দেশের মানুষ বাইরে গিয়ে তারকাদের ভাস্কর্য জাদুঘরে ছবি তোলে, সময় কাটায়। আমি সেরকম একটা কাজ দেশেই করতে চেয়েছি। এটি মূলত লন্ডনের মাদাম তুসো মিউজিয়ামের আদলে সাজানো হয়েছে। তবে আমি এটাকে জাদুঘর নয়, গ্যালারি হিসেবে নামকরণ করেছি।’

ছবি:তন্ময় মির্জা