মেহেদী হাসান গালিব
ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়া-আসার পথে কাইদুল বিস্ময়ভরা দু-চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকতো ট্রাফিক পুলিশদের দিকে। তাদের হাতের ইশারায় থেমে যেত শতশত যানবাহন, আবার তাদের হাতের ইশারাতেই চলতে শুরু করে সেসব! তখন কাইদুল সিদ্ধান্ত নেয় বড় হয়ে ট্রাফিক পুলিশ হবে। তবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় স্বপ্ন। যুক্ত হয় ইকারাসের ডানা, উড়ে যেতে ইচ্ছে করে সাফল্যের চূড়ায়। ইকারাসের ডানা নিয়ে স্বপ্নের পথে উড়াল দেওয়া সেদিনের কাইদুল আজ পৌঁছে গেছেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গুগলে! খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন কাইদুল ইসলাম।
এই পথচলা মোটেই সহজ ছিল না কাইদুলের জন্য। পথের বাঁকে বাঁকে ছিল প্রতিবন্ধকতা, ছিল ব্যর্থতার তিক্ততা। তবুও কখনো ভেঙে পড়েননি তিনি। আস্থা রেখেছেন নিজের ওপর, স্বপ্ন পূরণে থেকেছেন অবিচল। অতঃপর দিনশেষে ছিনিয়ে এনেছেন বিজয়ের মুকুট! ছোট ছোট স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন তিনি। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পরিশ্রম করেছেন তিনি।
উচ্চ মাধ্যমিক শেষে খানিকটা দ্বিধায় পড়েন কাইদুল। ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডাক্তারির মাঝে কোনটাকে বেছে নেবেন পরবর্তী জীবনে! অতঃপর কাইদুল খুঁজে পান উত্তর। সিদ্ধান্ত নেন ইঞ্জিনিয়ারিং হবেন। ২০১০ সালে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শুরু হয় কাইদুলের জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি উপার্জনের এমন একটি পথ খুঁজতে শুরু করেন যেখানে টাকার পাশাপাশি বৃদ্ধি পাবে তার দক্ষতা। অবশেষে কাইদুল খুঁজে পান তার কাঙ্ক্ষিত পথ, শুরু করেন ফ্রিল্যান্সিং। ওয়েব ও অ্যান্ড্রোয়েড ডেভেলপমেন্টের ছোট ও মাঝারি আকারের প্রজেক্ট করে অর্থের পাশাপাশি বাড়াতে থাকেন তার দক্ষতা।
দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন কাইদুল জানতে পারেন, গুগল থেকে একটি দল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে তাদের ক্যাম্পাসে পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করতে। ঠিক তখন থেকেই গুগলের প্রতি এক ধরনের কৌতুহল তৈরি হয় তার মাঝে। প্রশ্ন করেন নিজেকে—বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই প্রতিষ্ঠানটিতে কারা চাকরি করেন? বাংলাদেশ থেকেই বা ক’জন চাকরি করছেন সেখানে? কী কী জানলে এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া সম্ভব? নিজের মধ্যে জন্ম নেওয়া এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কাইদুল আশ্রয় নেন ইন্টারনেটের। জানতে পারেন অ্যালগরিদম, ডাটা স্ট্রাকচার ও প্রব্লেম সলভিংয়ে ভালো হওয়া প্রয়োজন। শুরু করেন প্রব্লেম সলভিংয়ের চর্চা।
প্রব্লেম সলভিংয়ের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, হ্যাকাথন ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট প্রতিযোগিতায়। তবে এসব প্রতিযোগিতার বেশিরভাগেই আশানুরূপ সাফল্যের দেখা পাননি কাইদুল। কিন্তু এতে হতাশ হননি, বরং বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সংখ্যা। ব্যর্থতা থেকেও শিখেছেন অসংখ্য অজানা বিষয়, খুঁজে বের করেছেন নিজের দুর্বলতা। তাই পরবর্তীতে এই ব্যর্থতাগুলোই যেন মজবুত করেছিল কাইদুলের সফলতার ভিত।
কাইদুলের চাকরি জীবন শুরু হয় কানাডাভিত্তিক ভিওআইপি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে। সেখানে সহকর্মী হিসেবে পাশে পান মাকসুদ হোসাইনকে। মাকসুদের সঙ্গে কাইদুলের আড্ডার বড় একটা অংশজুড়ে থাকতো বিগ ফোর (গুগল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজন)। তখন থেকেই কাইদুলের মনে বাসা বাঁধতে শুরু করে এক নতুন স্বপ্ন যে করেই হোক, বিগ ফোরের একটিতে পদচিহ্ন রাখা চাই-ই চাই।
বিগ ফোরের জন্য কাইদুল বিভিন্ন ওয়েবসাইটের প্রোগ্রামিং প্রব্লেম সলভ করতে শুরু করেন। বিভিন্ন অনলাইন প্রোগ্রামিং কন্টেস্টে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিশ্বের বড় বড় সফটওয়্যার প্লাটফর্মগুলো কিভাবে পরিচালিত হয় সে সম্পর্কে পড়াশোনা করতে শুরু করেন তিনি।
২০১৫ সালে কাইদুলের লিংকড-ইন প্রোফাইল নজরকাড়ে গুগল, লন্ডন অফিসের একজন রিক্রুটারের। তিনি তাকে গুগলে আবেদন করার পরামর্শ দেন। গুগলে আবেদন করেন কাইদুল। প্রাথমিক পর্যায়ের ফোন ইন্টারভিউয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হলে অনসাইট ইন্টারভিউয়ের জন্য তাকে ডাকা হয় গুগলের লন্ডন অফিসে। কিন্তু ভিসাজনিত সমস্যার কারণে আর লন্ডন যাওয়া হয়ে ওঠে না কাইদুলের। যেন স্বপ্নের অনেক কাছে এসেও তা হাতছাড়া হয়ে যায়।
এরপর ২০১৬ সালে ওরাকলে আবেদন করেন কাইদুল। সবগুলো ইন্টারভিউ বেশ ভালোভাবে সম্পন্ন করলেও শেষে গিয়ে চাকরির অভিজ্ঞতা কম থাকায় ওরাকল থেকে খালিহাতে ফিরতে হয় তাকে।
কিন্তু হতাশ হয়ে থেমে থাকেননি কাইদুল। বরং আগের তুলনায় দ্বিগুণ জেদ নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন আগামীর জন্য। এরপর ২০১৭ সালের জুলাই মাসে আমাজন থেকে একজন রিক্রুটার খুঁজে পান কাইদুলকে। তিনি তাকে চাকরির আবেদন করার পরামর্শ দিলে সেখানেও আবেদন করেন কাইদুল। কিন্তু এবারেও একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ে বাদ পড়তে হয়। একই বছরের নভেম্বর মাসে কাইদুল আবেদন করেন ফেসবুকের সিঙ্গাপুর অফিসে। কিন্তু এখানেও শেষ পর্যন্ত মিলেনি কোনো ইতিবাচক উত্তর। ২০১৮ সালে ফেসবুকের লন্ডন অফিস থেকে একজন রিক্রুটারের বার্তা পান কাইদুল। রিক্রুটারের কথামতো আবেদন করেন ফেসবুকের লন্ডন অফিসে। কিন্তু বাছাই পর্যায়ের এক পর্যায়ে এসে হঠাত্ করেই বন্ধ হয়ে যায় তাদের রিক্রুটমেন্ট প্রসেস। বারবার সম্মুখীন হওয়া ব্যর্থতা থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন কাইদুল। সঙ্গে নিজের ভেতরে জন্ম নেওয়া পরাজয়বোধ যেন রূপ নিতে শুরু করে জেদে।
এরপর ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আবার গুগলে আবেদন করেন। তবে এবারের আবেদনটা ছিল আগেরগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এবারের প্রস্তুতিটা ছিল একেবারে তার মনের মতো। তাই তার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গিয়েছিল আগের তুলনায় অনেক বেশি। গুগলের স্যান ফ্রান্সিসকো ও ইসরাইল অফিসে পরপর দুটি ফোন ইন্টারভিউ শেষে ৫টি অনসাইট ইন্টারভিউ সম্পন্ন হয় সুইজারল্যান্ডে। ইন্টারভিউয়ের সবগুলো ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর কাইদুল সম্মুখীন হন গুগলের ১০-১২ জন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে গঠিত হারায়িং কমিটির কাছে। সেখানেও সফলভাবে উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর গুগলের এক্সিকিউটিভ কমিটি কাইদুলের ফলাফল দেখে ইতিবাচক সাড়া দেন। অবশেষে কাইদুল পৌঁছে যান তার পথচলার শেষ ঠিকানায়। ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি গুগল থেকে অফার লেটার গ্রহণ করেন কাইদুল! দীর্ঘ পথচলা শেষে কাইদুল ছুঁয়ে দেখলেন সফলতার শেষ চূড়া।
এদিকে ফেসবুকে আবারো চাকরির আবেদন করেছিলেন কাইদুল। জানুয়ারির ২৫ তারিখে মিললো তার ফলাফল। ফেসবুকের সিঙ্গাপুর অফিস থেকে তাকে নিশ্চিত করা হয় তার চাকরির ব্যাপারে। তবে পরবর্তী চাকরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুগলকেই বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন কাইদুল। আগামী ১ এপ্রিল গুগলের জুরিখ অফিসে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগদান করবেন কাইদুল। তবে এখানেই পথচলা থামাতে চান না নিত্য-নতুন স্বপ্ন দেখা এই তরুণ।
কাইদুলের এই অর্জন যেমন তার জীবনের গল্পে যোগ করেছে এক নতুনমাত্রা তেমনি বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।