মুনতাসীর আল মামুন
১০ জানুয়ারি পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে মনে হলো যুদ্ধ জয় করে এসেছি। তখনো চোখ-মুখে ক্লান্তির ছাপ। কিভাবে দূর করা যায় ক্লান্তি?
এক বন্ধু প্রস্তাব করলো, ‘চল, ইটা খোলা আর রূপবান মুড়াতে যাই।’ প্রস্তাবে রাজি গেলাম। তারপর খাওয়া-দাওয়া শেষ করে তিন বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম ইটা খোলার পানে। জায়গাটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশি দূরে নয়।
১০ মিনিটের রাস্তা ভাড়াও ১০ টাকা।
এত কাছে থেকেও কখনো যাওয়া হয়নি আগে। ‘বাড়ির পাশে আরশি নগর, সেথা এক পড়শি বসত করে। আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’—লালন সাঁইজির মতো! অটোতে চড়ে মুুহূর্তেই পৌঁছে গেলাম প্রাচীন সে চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যপুরীতে।
আহা! মুহূর্তেই চোখ জুড়িয়ে গেল শান্ত বিকেলের স্নিগ্ধ ইটা খোলার রূপ দেখে। সবার আগে দৌড়ে উঠে গেলাম প্রাচীন সে ব্যস্ত সিঁড়ি বেয়ে ইটা খোলার ওপরে। বিকেলের জনমানব শূন্য ইটা খোলার ধ্বংসাবশেষের ওপর থেকে দেখতে লাগলাম ইটা খোলা মুড়ার সৌন্দর্য। তিন বন্ধু মিলে ঘুরে বেড়ালাম ইটা খোলার প্রতিটি কোণা আর হারিয়ে গেলাম সহস্রাধিক বছর আগের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনের পরতে পরতে।
জানতে পারলাম বিহারটি প্রাচীনকাল থেকে ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহূত হতো বলে এমন নামকরণ। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে বিহারটিতে বড় বড় কিছু বৌদ্ধ স্তুপ ও মঠের সন্ধান পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয় বিহারটি ৫টি সাংস্কৃতিক যুগ অতিক্রম করেছে। পূর্ববর্তী তিনটি সাংস্কৃতিককালের নিদর্শনগুলো পরবর্তীকালের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে। আক্ষেপের সূরে বলে উঠলাম, ‘ইশ! যদি সেগুলাও দেখতে পেতাম।’
ইটা খোলা মুড়া থেকে অল্প একটু সামনেই রাস্তার অপরপাশে কুমিল্লা বিজিবি ক্যাম্পের সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত প্রাচীন আরেকটি প্রত্নতাত্ত্বিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রূপবান মুড়া। এবার ছুটলাম রূপবান মুড়ার রূপ আস্বাদনে। রাস্তা থেকে খাঁড়া ওপরের দিকে খুব সম্ভবত ৪৫ ডিগ্রি কোণে একটা সরু ইট সুরকির রাস্তা উঠে গেছে ঘন ঝোপঝাড় বেষ্টিত ছোট একটি পাহাড়ের চূড়ায়। অনেকখানি শক্তি ক্ষয় করে ওপরে উঠেই দেখতে পেলাম সবুজের রাজ্য আত্মগোপন করা প্রাচীন রূপবানের রূপ। ইটা খোলার চেয়ে কোনো অংশেই তার রূপের কমতি আমার দৃষ্টিগোচর হলো। ধ্বংস হতে হতে এখনো অনেকখানি অমলিন। তবে এখানেও ধ্বংসাবশেষের নিচে ঢাকা পড়েছে কয়েকটি সাংস্কৃতিক যুগের নির্মাণশৈলী। শুধু সর্বশেষ যুগের নিদর্শনটিই বর্তমান। রূপবান মুড়ায় রয়েছে একটি আকর্ষণীয় ক্রুশাকৃতি সমাধি মন্দির। পাশেই একটা আটকোণা বেদি। মন্দিরের তিনটি লম্বা বাহুতে রয়েছে তিনটি ভজনালয়। ক্রুশাকৃতি সমাধি মন্দিরের চূড়ায় বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। ইটা খোলার মতো রূপবান মুড়ার রূপকেও ক্যামেরাবন্দি করতে তিন বন্ধু সদা ব্যস্ত ছিলাম। ছবিগুলোই ছোট্ট এ ভ্রমণের আনন্দকে আরো শোভামণ্ডিত করেছে। তারপর মোয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনিতে ভর করে চারদিকে অন্ধকার নেমে এলো। আমরাও অটোতে ভর করে হোস্টেলে ফিরে এলাম। সত্যিকার অর্থেই এই ভ্রমণটি সেমিস্টারের হাইপেশার কমাতে দারুণ টনিক হিসেবে কাজ করেছে।
শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়