দেশে ব্যাপক হারে বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৬৯ জন। এটি দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। দেশে এই প্রথম ৬ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হলো। নতুন শনাক্ত হওয়াদের নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে শনাক্ত হয়েছেন ৬ লাখ ১৭ হাজার ৭৬৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৫৯ জন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মারা গেলেন ৯ হাজার ১০৫ জন। সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে আগ্রহ নেই অনেকের। গ্রামগঞ্জের মানুষ মাস্ক পরেই না। সরকারের ১৮ দফা নির্দেশনাও সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলেন, করোনার লন্ডন ভ্যারিয়েন্ট দেশে দ্রুত ছড়াচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং বিদেশফেরতদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত না হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে। মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে হবে। বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা আরো বলেন, দেশে করোনার সংক্রমণ যে গতিতে ছড়াচ্ছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম সেই গতিতে এগোচ্ছে না। প্রতিকারই উত্তম ব্যবস্থা হলেও কেউ মানছে না স্বাস্থ্যবিধি। করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে না পারলে দেশ কঠিন অবস্থায় পড়বে। তবে এটা রোধ করা কারোর একার পক্ষে সম্ভব নয়। মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এদিকে দেশে করোনা সংক্রমণের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে হাসপাতালে কানায় কানায় রোগী ভর্তি। সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) বেড পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ শয্যাও ফাঁকা নেই অধিকাংশ হাসপাতালে। হাসপাতালে শয্যার সংকটে বিপাকে পড়েছেন রোগীরা। আর আইসিইউর সংকটে বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি। আইসিইউর জন্য হাহাকার করছেন রোগীর স্বজনেরা।
বাংলাদেশে গত বছরের ৮ মার্চ করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার এক বছর পর গত সোমবার প্রথমবারের মতো এক দিনে ৫ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্তের খবর আসে। তার মধ্য দিয়ে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ছাড়িয়ে যায়। তিন দিনের মাথায় দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৬ হাজারও ছাড়িয়ে গেল। দৈনিক মৃত্যুর এই সংখ্যা মহামারি শুরুর পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর গত বছরের ১৮ মার্চ দেশে করোনা ভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছিল সরকার। বুধবার তা ৯ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে ৩০ জুন এক দিনেই ৬৪ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়, যা এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু। টানা কয়েক দিন ধরে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হারও বেড়ে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ হয়েছে, যা গত ৯ আগস্টের পর সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে গত এক দিনে বাসা ও হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আরো ২ হাজার ৫৩৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাতে এ পর্যন্ত সুস্থ রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৯৩৮ জন হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে মোট ২২৪টি ল্যাবে ২৮ হাজার ১৯৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ৪৬ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৪টি নমুনা। ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮৮ দশমিক ২১ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
দেশে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৯ হাজার ১০৫ জনের মধ্যে ৬ হাজার ৮৪৭ জনই পুরুষ এবং ২ হাজার ২৫৮ জন নারী। তাদের মধ্যে ৫ হাজার ৯০ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। এছাড়া ২ হাজার ২৪৮ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ১ হাজার ৩০ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, ৪৫৩ জনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, ১৭৯ জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, ৬৭ জনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এবং ৩৮ জনের বয়স ছিল ১০ বছরের কম। মৃতদের মধ্যে ৫ হাজার ১৯২ জন ঢাকা বিভাগের, ১ হাজার ৬৪৫ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৫০৬ জন রাজশাহী বিভাগের, ৫৮৬ জন খুলনা বিভাগের, ২৭৪ জন বরিশাল বিভাগের, ৩২৫ জন সিলেট বিভাগের, ৩৭৪ জন রংপুর বিভাগের এবং ২০১ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।
মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দেশে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলা বেড়ে ৩১টি হয়ে গেছে। অন্যান্য সময়ের মতো ঢাকায় সংক্রমণ বেশি শনাক্ত হলেও গত দুই সপ্তাহে মৌলভীবাজারে সর্বোচ্চ সংক্রমণের হার দেখা গেছে। তিন সপ্তাহ আগে যেখানে এই জেলায় সংক্রমণের হার ছিল ৫ শতাংশ, সেখানে গত দুই সপ্তাহে সংক্রমণের হার ৩০ শতাংশ। এছাড়া মুন্সীগঞ্জ ও চট্টগ্রামে গত দুই সপ্তাহে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংক্রমণের হার দেখা গেছে। রাজধানী ঢাকায় গত দুই সপ্তাহে সংক্রমণের হার ছিল তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ। ইতিমধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে সরকারের ১৮ দফা নির্দেশনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।