অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামান
অধ্যাপক, হূদরোগ বিভাগ
বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকার মতিঝিল আইডিয়াল প্রাথমিক বিদ্যালয়। যা পরবর্তীতে মতিঝিল আইডিয়াল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ হয়েছে।
১৯৭৩-এ আমি প্রথম স্কুলে যাই। আমার স্কুলে যাওয়ার প্রতি আগ্রহ ছিল। প্রথম স্কুলে গিয়েছিলাম বাবার হাত ধরে সাদা শার্ট নীল প্যান্ট পরে। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলাম।
আমাদের বাসা ছিল ঢাকার মতিঝিল এজিবি কলোনিতে। তাই মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলেই আমি প্রথম শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়েছি। সে সময় এই কলোনির সন্তানদের জন্য স্কুলটি করা হয়েছিল।
যেহেতু একটি স্কুলে পড়েছি, তাই মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলই আমার প্রিয় স্কুল। তখন টিনশেড স্কুল রুম ছিল। পরবর্তীতে সেখানেই বিশাল ভবন তৈরি করা হয়।
ভেতরের সেই মাঠটি এখনো আছে। যদিও মাঠটি আরো বড়ো ছিল। সকালে ক্লাস শুরু হতো। চারদিকে প্রচুর গাছপালা ছিল। স্কুল শুরু হওয়ার আগে পিটি বা ড্রিল করা হতো। তখন আমাদের খুব আনন্দ হতো। আনন্দ দিয়েই ক্লাস শুরু হতো, শেষও হতো আনন্দের মধ্য দিয়ে।
বছরে একবার প্রত্যেক শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হতো। এখনো ভেবে অবাক হই এতো আগে স্কুলটিতে এসব ব্যবস্থা ছিল।
যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন গনি স্যার।
মাধ্যমিক শাখার প্রধান শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক ফয়জুর রহমান। তিনি কঠোর প্রশাসক ছিলেন। আমার জীবন বদলে দিয়েছিলেন দেলোয়ার স্যার। তিনি বিজ্ঞান ও গণিত পড়াতেন। তিনি আমার মধ্যে পড়ালেখার স্পৃহা প্রবল করে তুলেছিলেন। আবুল কালাম স্যারের কথাও বলা যায়। তিনিও গণিত ও বিজ্ঞান পড়াতেন। এছাড়া শামসুজ্জামান স্যার বিজ্ঞান পড়াতেন, কাউছার স্যার ইংরেজি পড়াতেন, বাংলা পড়াতেন মোজাম্মেল স্যার, জীববিদ্যার শফিকুর রহমান স্যার, স্পোর্টসের টিচার ছিলেন ইমরান স্যার। আনন্দের ব্যাপার কাউছার স্যারের হূদপিণ্ডে অস্ত্রোপচারের সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। সেজন্য নিজেকে ধন্য মনে করি।
তাঁরা এমনভাবে পড়াতেন তাতে বিষয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হতো। তারা একটি পড়া সহজেই রপ্ত করার কৌশল শিখিয়ে দিতেন।
আমাদের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকে একটি ডায়েরি দেওয়া হতো। সেই ডায়েরিতে প্রত্যেক ক্লাসে আমাদের পারফরমেন্স নাম্বারিং করা হতো। সেই ডায়েরি বাসায় এসে অভিভাবকদের দেখাতে হতো। তারা দেখে স্বাক্ষর করতেন। সেটা পরেরদিন ক্লাসে দেখানো লাগতো। ফলে অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হতেন। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও শৃঙ্খলার ব্যাপারে সচেতন থাকত।
বাংলা সাহিত্য আমার সব সময় ভালো লাগতো। নিজেই বাংলা বিষয়ের নোট করতাম।
গণিত। বুঝতে কষ্ট হতো। পরে বিষয়টি সহজ করে দিয়েছিলেন দেলোয়ার স্যার। ফলে এসএসসিতে গণিত বিষয়ে আমি ১০০ তে ৯৯ পেয়েছিলাম।
এসএসসির আগে ১০/১২ ঘণ্টা পড়তাম। এর আগে অবশ্য এতো পড়তাম না। খেলাধুলা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকতাম। এমনকি ‘হায়ারে’ ফুটবল খেলতে যেতাম।
আমার বাবাই আমাকে স্কুল থেকে ফেরার পর বাসাতে পড়াতেন।
স্কুলজীবনে আমি শিক্ষক হতে চাইতাম। তাই হয়েছি। আমরা যেভাবে মনের আনন্দে খেলাধুলা করার সুযোগ পেয়েছি আমার সন্তানরা তা পাচ্ছে না। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ায় স্কুলের সঙ্গে তাদের আবেগিক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না। শিক্ষার মধ্যে সৃজনশীলতা দেখছি না। শিক্ষায় যথেষ্ট প্রাণ নেই, আনন্দ নেই। আছে এ প্লাস পাওয়ার প্রতিযোগিতা।
আমি প্রচুর বই পড়তাম। আমাদের বাসায় প্রচুর বই ছিল। মা পড়তেন। শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নীহার রঞ্জন গুপ্তের বই আমি খুব পড়তাম। আমি প্রচুর ফুটবল খেলতাম। এছাড়া আমি পত্রিকায় লিখতাম। তখন জনপ্রিয় পত্রিকা ইত্তেফাকের চিঠিপত্র কলামে আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছিল।
বিজয়দিবস উপলক্ষে স্কুল জীবনে ‘রক্তিমসূর্য’ নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করেছিলাম। লেটার প্রিন্টে বইটি ছাপা হয়েছিল।
পাঠ্যবিষয়ের পাশাপাশি মানবিকগুণের বিকাশে স্কুলগুলো খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না। দ্রুত শিক্ষা বিষয়ক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসছে। চিন্তাশক্তি ও দেশপ্রেম যেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃদ্ধি পায় সেদিকে নজর দেয়া উচিত। পাঠ্যজ্ঞান জীবনে প্রয়োগ করার ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। বহুধা বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থা জাতির ঐক্য স্থাপনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে বলে আমার মনে হয়। শিক্ষার মধ্যে যেন তারা আনন্দ খুঁজে পায়। সনদের পরিবর্তে আত্মউন্নয়নের জন্য যেন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রদ্ধা ও ভালোবাসা যেন বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটানো খুবই প্রয়োজন। যা তাকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।