এখন বোরো মৌসুম চলছে। এই মৌসুম বাংলাদেশের কৃষির ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সারা দেশে যে পরিমাণ বোরো ধান উত্পন্ন হয়, তার সিংহভাগ উত্পন্ন হয় হাওরাঞ্চলে। সম্প্রতি হাওর নিয়ে বেশ আলোচনা উঠে এসেছে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঘিরে। সেখানকার সাবমরজিবল ও অলওয়েদার খ্যাত নবনির্মিত রাস্তাঘাট পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। কাজেই হাওর নিয়ে এখন ভ্রমণপিপাসুদের আগ্রহের অন্ত নেই। আর হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান হওয়ায় এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক। একদিকে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত হওয়ায় দিনে দিনেই হাওরের গুরুত্ব বেড়ে চলেছে। আর সে কারণেই বিষয়টি নিয়ে সামনে আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
হাওর মানেই বিস্তীর্ণ দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ। আবার বর্ষাকালে সেখানে থইথই পানি। সবগুলোই দৃষ্টিনন্দন বিষয়। এর নান্দনিকতা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পায় সাম্প্রতিক হাওর উন্নয়নে গৃহীত কার্যক্রমে। একসময় হাওরের কথা শুনলেই গা শিউরে উঠত। কোনো সরকারি চাকুরে তার পোস্টিং নিয়ে হাওরে যেতে চাইতেন না। কিন্তু এখন সময় পালটেছে। এমন সময় খুব দূরে নয়, যখন সেখানে তদবির করে যেতে চাইবেন অনেকে। কারণ সেখান প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত। সরাসরি নদীর তাজা মাছ, খেতের তরিতরকারি, শাকসবজি, চাল-ডাল, ডিম-দুধ, দেশীয় ফলমূল ইত্যাদি সহজেই পাওয়া যায় সতেজ ও সুলভ মূল্যে।
এই তো মাত্র গত বছরের (২০২০) নভেম্বর-ডিসেম্বরে যেসব এলাকা ছিল একেবারে পানির নিচে, আর মাত্র দুই-তিন মাসের ব্যবধানে এখন সেসব এলাকাই সবুজের সমারোহে ভরপুর। সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালে যেন প্রাণ-মন জুড়িয়ে যায়। বোরো ধান আবাদের জন্য খুবই উপযুক্ত এলাকা এটি। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, সারা দেশের বোরোর একটি বড় অংশ উত্পাদিত হয় এই হাওরাঞ্চলে। এখানে একমাত্র ফসল বোরো হওয়ায় কৃষককে আশানিরাশার দোলাচলে দুলতে হয় সর্বদা। কারণ আমরা জানি, বোরো ফসলের উত্পাদন ও সংগ্রহ দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ। উত্পাদন যতই হোক না কেন, যদি সময়মতো সংগ্রহ ও মাড়াই করা না যায়, সেটি বিপর্যয় ডেকে আনে।
আমরা পুরো বর্ষা মৌসুমে যখন হাওরে ভ্রমণ করি, তখন একধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখি, আবার যখন এই শুস্ক মৌসুমে সেখানে যাই, সম্পূর্ণ উলটো চিত্র ও পরিবেশ দেখতে পাব। শীতকালে বোরো ধান রোপণের সময়। আর তখন পানি কম থাকে বিধায় সেখানে মাছগুলো ধরা পড়তে থাকে। আবার এখনকার ওয়েদারে শুধু সবুজের সমারোহ। যেদিকেই তাকান, শুধু সবুজ আর সবুজ। আর মাত্র কয়েক দিন পরেই আবার সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ হবে অন্যরকম। তখন ধানের শিষ বের হবে। তারপর ধান পাকতে শুরু করবে। কাজেই যারা ভ্রমণপিপাসু ও সৌন্দর্যপ্রিয়, তারা যে কোনো সময়েই হাওরের এমন অলওয়েদার রূপ দেখতে যেতে পারেন।
হাওরের এমন উন্নয়নের রূপকার হলেন আমাদের হাওরের শার্দূলখ্যাত বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তার সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল হাওরকে এমন একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া। সেখানে কিশোরগঞ্জ সদরের সঙ্গে ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম—এই তিন উপজেলাকে আপাতত সড়কযোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার চেষ্টা করেছেন। সেখানকার যোগাযোগ, বিদ্যুতায়ন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। এগুলো প্রকারান্তরে সেখানকার কৃষিকেই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। কারণ হাওরের বোরো ধান ঘরে তোলা যেহেতু একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেজন্য সেখানকার রাস্তাঘাট কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
কাজেই পরিশেষে বলতে হয়, হাওর শুধু বর্ষাকালের পর্যটন-সম্ভাবনা নয়, সেটি সারা বছরের একটি কমপ্রিহেনসিভ পর্যটন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। সেখানকার দিগন্তজোড়া অথৈ পানি যেমন ভ্রমণপিপাসুদের মন তুষ্ট করতে পারে, ঠিক তেমনিভাবে বছরের অন্য সময়েও সেটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং বর্ষাকালে যেসব জায়গায় নৌকা ও জলযান ছাড়া যাতায়াত করা যায় না, বছরের অন্যান্য সময় সেখানে নৌকা কিংবা কোনো জলযানের প্রয়োজন হয় না।
আমাদের দেশসহ বিশ্বে যে করোনা পরিস্থিতির ভয়াল থাবা চলছে, সেখানে কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। আর সেই পরিস্থিতিতে হাওরের বোরো ধান, মাছ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ আমাদের খাদ্য চাহিদার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিটিয়ে থাকে। কাজেই হাওরের মানুষের জন্যও এখন সেখানকার পর্যটন বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এখন সেখানকার মানুষ তাদের নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে। কারণ তারা এখন শুধু কৃষক নয়, তারাও দেশের মানুষের মনোরঞ্জনের উপলক্ষ্য হতে পারছে। সামনের দিনগুলোতে এই গুরুত্ব বাড়তেই থাকবে।
n লেখক :ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়