হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলাবাসীর অবস্থা আলোর নিচে অন্ধকারের মতোই। দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র নবীগঞ্জের বিবিয়ানা। এটি বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদার মোট ৮০ শতাংশ পূরণ করছে। বিবিয়ানা গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র চালু হওয়ায় গ্যাস ও বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে। কিন্তু নবীগঞ্জবাসী পল্লীবিদ্যুতের বিভ্রাট—ঘন ঘন লোডশেডিং ও কম ভোলটেজের কারণে এখন অতিষ্ঠ। সামান্য ঝড়-তুফান হলেই ভেঙে বা হেলে পড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি। আর এতেই বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকে দিনের পর দিন।
বিদ্যুত্ বিভ্রাটে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কও ব্যাহত হয়। বিদ্যুত্ না থাকলে অপারেটররা তিন-চার ঘণ্টা পর্যন্ত নিজেদের ব্যবস্থায় নেটওয়ার্ক চালাতে পারে, কিন্তু এর বেশি হলে সাইট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহান প্রবাসে থাকা স্বজনরা। করোনাভাইরাস প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। অনেকে কাজ হারিয়ে হয়েছেন দিশেহারা। কেউ কেউ আক্রান্ত স্বজনদের জন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন। অন্যদিকে প্রবাসে থাকা প্রবাসীরা চিন্তায় থাকেন দেশের স্বজনদের নিয়ে। প্রতিদিন স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। কিন্তু বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে ইদানীং দুর্ভোগের শেষ নেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা নবীগঞ্জের প্রবাসী ও দেশে থাকা তাঁদের স্বজনদের।
এদিকে নবীগঞ্জে বিদ্যুত্ বিভ্রাটের কারণে পৌর এলাকাসহ উপজেলার ৩৫৪ গ্রামের সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড দাবদাহের শিকার। গ্রাহকদের কোনোরকম অবগতি ও নোটিশ ছাড়াই সারা দিন বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়। রাতেও বিদ্যুত্ বিহীন থাকতে হচ্ছে এই উপজেলার মানুষকে। অনেক সময় এক রাতে বিদ্যুত্ গেলে পরের রাতেও বিদ্যুতের খোঁজ মেলে না। জানা গেছে, গেল সপ্তাহে ঝড়ের কারণে পল্লীবিদ্যুতের আওতাধীন নবীগঞ্জ পৌর এলাকা, শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একটানা প্রায় চার দিন বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এভাবে এখানকার কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিপণি বিতান ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
হবিগঞ্জ পল্লীবিদ্যুত্ সমিতির নবীগঞ্জ জোনাল অফিসের আওতায় আছেন ৫০ হাজারেরও বেশি গ্রাহক। তাঁদের শাহজীবাজার গ্রিড সাবস্টেশন থেকে ৫৪ কিলোমিটার দূরে ৩৩ কেভি বৈদ্যুতিক লাইনের মাধ্যমে নবীগঞ্জ উপজেলায় স্থাপিত ১৫ এমভিএ বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হয়। একই লাইনে বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হয় নবীগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচংয়ে। আন্ডার সাইজের একই লাইনে চার উপজেলায় সংযোগ দেওয়ায় ঘন ঘন বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। চার উপজেলার এক লাইন হওয়ায় যে কোনো এক উপজেলায় কোনো সমস্যা হলে একযোগে চার উপজেলাতেই বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকে। বর্তমানে ঝড়ের মৌসুম হওয়ায় এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সূত্রমতে, বৈদ্যুতিক বিতরণ লাইনের এক-তৃতীয়াংশই ওভারলোডেড। সমতার চেয়ে বেশি সংযোগ প্রদান ও পুরনো লাইনের কারণে বিতরণ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাই অল্প ঝড়-বৃষ্টিতে বিদ্যুত্ বিতরণ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঝড়-বৃষ্টির সময় গাছের ডাল পড়ে শর্টসার্কিট হয়ে অনেক সময় লাইন ট্রিপ করে। এছাড়া প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া থাকলেও বজ্রপাতের সময় অতিরিক্ত বিদ্যুত্ প্রবাহের ফলে ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়। এতেও বিদ্যুত্ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়।
গত তিন-চার বছর ধরে লাইন মেরামতের অজুহাতে সপ্তাহে দু দিন (শুক্র ও শনি বার) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকে। কোনো কোনো দিন রাত ১০টাও হয় বিদ্যুত্ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে।
প্রবাসীরা বিদ্যুতের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। আরব আমিরাত প্রবাসী সুহেল মিয়া বলেন, ‘দেশে আমার স্ত্রী অসুস্থ, খোঁজখবর নিতে পারছি না। আমার বাড়িতে ওয়াইফাইর সুবিধা রয়েছে, কিন্তু বিদ্যুত্ না থাকলে ওয়াইফাই চলে না। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে মুঠোফোনে কল দেই—‘হ্যালো’ বলার আগেই কেটে যায়, পরে সংযোগ পাওয়া যায় না। এভাবে তিন-চার দিন একটানা যোগাযোগ করতে পারিনি। পরে জানতে পারি বিদ্যুত্ না থাকলে মোবাইল ফোন কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।’
পরিশেষে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
আরব আমিরাত