মাস্ক ছাড়া গতি নাই

বর্তমান করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনেকেই লকডাউনের কথা বলছেন। আমি কেন জানি এর সঙ্গে একমত হতে পারছি না। লকডাউনে সুযোগসন্ধানী ও স্বার্থান্বেষী মহলের তত্পরতা বহুগুণে বেড়ে যায়। আমাদের দেশে দুর্নীতি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের লোকেরা যেভাবে নিজেদের আত্মীয়স্বজনের নাম লিখিয়ে বিধবাভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা তুলে নেয়; ঠিক তেমনি ত্রাণসামগ্রীর বিরাট অংশ তারা গত লকডাউনে লুটে নিয়েছে। এমনও দেখেছি পরিচিত মুখগুলোকে বারবার ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। অথচ তাদের পাশের ঘরে রহস্যময় কারণে ত্রাণসামগ্রী  পৌঁছানো হয়নি।

দলের লোক দেখে ত্রাণ দেওয়া—এটা আমাদের দেশে নতুন কোনো সংস্কৃতি নয়। ত্রাণ বিতরণ হয় দলের লোকের মধ্যেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত যারা এ দলেও না ও দলেও না—তারা না পারে বলতে, না পারে সহ্য করতে। যারা কেড়ে খেতে পারে তাদের কোনো সমস্যা নাই। স্বল্প আয়ের অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লকডাউনে সর্বস্ব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিল। তারা এখনো উঠে দাঁড়াতে পারেনি। আর কিছু কিছু মানুষকে  দেখে অবাক হয়েছি। যারা লকডাউনে সাময়িকভাবে একটু বেকায়দায় পড়েছিল, তারা সুযোগে নির্লোভ ব্যক্তিদের জিম্মি করে মিথ্যা কথা বলে সুদে আসলে টাকাপয়সা আদায় করে নিয়েছে।

এই করোনাকালে ব্যবসায়ীরা যে যেভাবে পারে মানুষকে ঠকাচ্ছে। আমার মনে হয়, করোনা পরিস্থিতির এমন ভয়াবহ অবস্থা আমরাই সৃষ্টি করেছি। জনসমাগম এড়িয়ে চলার কথা বলা হলেও বিয়ে, জিয়াফত, সভা-সেমিনার, কনসার্ট, উত্সব-অনুষ্ঠানে লোকের সমাগমকে পাত্তাই দিইনি। সরকার তার দায়িত্ব-কর্তব্য করেছে। কিন্তু আমরা সচেতন হইনি। মাস্ক পরিধান করাকে হেসে উড়িয়ে দেন অনেকেই। মৃত্যুভয় নিজের না থাকুক ভালো কথা। কিন্তু অন্যকে সংক্রমিত কেন করব? এই বোধটুকু আমাদের মধ্যে নেই।

বর্তমানে আমাদের জেলায় করোনা সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। যাঁরা পরীক্ষা করাচ্ছেন তাঁদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হচ্ছেন শতকরা ২২ ভাগেরও বেশি। আমরা যারা করোনাকে গুরুত্ব দিচ্ছি, তারা আছি আতঙ্কে। আর যারা করোনাকে পাত্তা দিচ্ছে না তাদের এইসব খবরে কিছু যায় আসে না। তারা রাস্তায় স্বাভাবিক সময়ের মতোই মুখে মাস্ক ছাড়া চলাফেরা করছেন।

পহেলা এপ্রিল বিকেলে আমাদের শহরে (মৌলভীবাজার) দেখলাম জেলা তথ্য অফিস থেকে মাইকিং করা হচ্ছে—জনসমাগম এড়িয়ে চলুন, মাস্ক পরিধান করুন...। কে শোনে কার কথা। মাইকিংয়ের গাড়ির সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে মাস্ক ছাড়া চলাফেরা করছে মানুষ। বড়জোর পুলিশের গাড়ি দেখলে গলায় কিংবা থুতনিতে বাঁধা মাস্ক তুলবে নাকের ওপরে। তারপর সেই আগের মতো করে হাঁটবে। কী মজা!  দোষ কেবল সাধারণ মানুষকে দেব কেন? টেলিভিশনে আমাদের নেতা-নেত্রীদেরও তো দেখি, তাঁরা মাস্ক থুতনিতে নামিয়ে কথা বলছেন!

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সব অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ করা হবে। সীমিতভাবে দাওয়াত দিলে লোকে হাসবে। এই হলাম আমরা। এই অবস্থা রোধে ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ এই স্লোগান পালটে সারা দেশে  স্লোগান হোক ‘নো মাস্ক নো মুভমেন্ট’। এটা কার্যকর করলে আমরা করোনা অনেকটাই প্রতিরোধ করতে পারব ইনশাল্লাহ।

মৌলভীবাজার