ঐক্যবদ্ধ না হলে জলবায়ু যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত :প্রধানমন্ত্রী

পৃথিবীকে বাঁচাতে এ বছরের শেষে গ্লাসগোতে ২৬তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ২৬) বসার আগেই উন্নত দেশগুলোর তরফ থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা আশা করছেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা ৪৮ উন্নয়নশীল দেশের জোট ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনকে অর্থবহ করতে সিভিএফ-কপ২৬ ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ সম্মাননা জয়ী শেখ হাসিনা ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘প্রকৃতির রুদ্ররোষের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ না হলে আমাদের পরাজয় নিশ্চিত। যে প্রকৃতি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, খুব সচেতনভাবে আমরা তাকে ধ্বংস করে চলেছি।

‘গ্রেটা থুনবার্গ অথবা বাংলাদেশের কোস্টাল ইয়ুথ অ্যাকশন হাবের তরুণ পরিবেশকর্মীদের আমরা কোন পৃথিবী রেখে যাব? কপ২৬ এ তাদের ভবিষ্যত্ আমরা জলাঞ্জলি দিতে পারি না।’

নিবন্ধের শুরুতেই শেখ হাসিনা স্মরণ করেছেন ২০২০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার কথা। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট হিলডা হাইন ২০১৯ সালে ঢাকায় এসেছিলেন অভিযোজন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে। সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনের সঙ্গে শেখ হাসিনা ছিলেন সেই সম্মেলনের কো-চেয়ার। যেসব উন্নত দেশ সবচেয়ে বেশি দূষণ ঘটাচ্ছে, সেসব দেশকে সেই সম্মেলন থেকে তারা সতর্ক করেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির যে মাত্রা, তার তুলনায় বিশ্বের নেওয়া অভিযোজন পদক্ষেপ নিতান্তই অপ্রতুল। কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে, যাদের কেউ আশ্রয় দিতে চায় না।

শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমরা তাদের হুঁশিয়ার করে বলেছিলাম, প্রকৃতির রোষ থেকে সুরক্ষার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা কোনো দেশ বা কারো নেই।’ প্রধানমন্ত্রী তার নিবন্ধে বলেন, সেই সম্মেলনে হিলডা হাইন যখন বাংলাদেশকে সিভিএফের পরবর্তী সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব করলেন, তখন তার মনে হয়েছিল, জলবায়ু সংকটে বিশ্ব যেখানে পৌঁছেছে, আর অভিযোজনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে সাফল্য দেখিয়েছে, তাতে সিভিএফের নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশের দায়িত্ব।

২০০৯ সালে মালদ্বীপের নেতৃত্বে বাংলাদেশসহ ১০টি দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করা সিভিএফ এখন বিশ্বের শতকোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে।

শেখ হাসিনা লিখেছেন, বাংলাদেশকে বলা হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ‘গ্রাউন্ড জিরো’। এ দেশের বহু মানুষের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মানে অস্তিত্বের সংকট। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশ তার জিডিপির ২ শতাংশ হারায়; এই শতকের শেষে তা পৌঁছাবে ৯ শতাংশে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা এভাবে বাড়তে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১৭ শতাংশ চলে যাবে পানির নিচে, তাতে বাস্তুচ্যুত হবে ৩ কোটি মানুষ।

‘ইতিমধ্যে ৬০ লাখ বাংলাদেশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুহারা হয়েছে। তারপরও আমরা ১ কোটি ১০ লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করে চলেছি, আর সেজন্য আমাদের পরিবেশগত মূল্যও চুকাতে হচ্ছে। এর ক্ষতিপূরণ আমাদের কে দেবে?’

বাংলাদেশসহ যেসব দেশ ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সদস্য, জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের ভূমিকাই যে সবচেয়ে কম, সে কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘জলবায়ু অবিচার বন্ধের জন্য উদ্যোগী হওয়ার সময় এসেছে এখন।’ বাংলাদেশকে যে একটি কঠিন সময়ে সিভিএফের নেতৃত্ব নিতে হয়েছে, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ২০২০ সালে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার খুব কাছে পৌঁছে গেছে। বড় অর্থনীতির দেশগুলো ২০২০ সালের শেষ সময়ের আগে তাদের ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কনট্রিবিউশনস-আইএনডিসিএস’ (উষ্ণায়ন কমাতে পরিবেশগত কার্যক্রমের রূপরেখা) হালনাগাদ করতে হিমশিম খাচ্ছিল। আর যুক্তরাষ্ট্র কয়েক বছর ধরেই জলবায়ু সহযোগিতাকে কম গুরুত্ব দিয়ে আসছিল।

প্যারিস সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়নের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে তহবিল পাওয়া গেছে ঢের কম। জি টোয়েন্টিভুক্ত দেশগুলো, যারা বিশ্বের মোট কার্বন গ্যাস নিঃসরণের ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী, তারা জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ‘আর তার মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এলো কোভিড-১৯ মহামারি। তাতে জলবায়ু, স্বাস্থ্য আর প্রকৃতির ত্রিমুখী সংকটে পড়ল বিশ্ব। আমি হুঁশিয়ার করেছিলাম, বলেছিলাম জলবায়ু সংকট আসলে বিশ্বের জন্য একটি জরুরি পরিস্থিতি, শেষ পর্যন্ত কঠোর বাস্তবতা সেই জরুরি বিষয়টি বুঝতে বিশ্বকে বাধ্য করল।’

শেখ হাসিনা বলেন, পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে অভিযোজনের জন্য অর্থায়ন বাংলাদেশসহ সিভিএফের সদস্য দেশগুলোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাতে তাদের ক্রমাগত সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে।

ঢাকায় গ্লোবাল সেন্টার ফর অ্যাডপটেশনের আঞ্চলিক অফিস করার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী নিবন্ধে লিখেছেন, এই কার্যালয় ইতিমধ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব জোরদারে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়কে ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি দশক’ ঘোষণা করে সিভিএফের সদস্য দেশগুলোকে ‘জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ নিতে বলেছে, সে কথাও তিনি তার লেখায় উল্লেখ করেছেন।

‘কিন্তু নিজেদের চেষ্টায় সিভিএফ কতটুকুই বা করতে পারবে। অভিযোজনেরও তো একটা সীমা আছে! সেজন্য সিভিএফ-কপ২৬ শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। আগামী নভেম্বরে জলবায়ু সম্মেলনে আমরা ঢাকা-গ্লাসগো-সিভিএফ-কপ২৬ ঐক্যের ঘোষণা চাই।’

সেই সম্মেলনের আগে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর রূপরেখা চাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় করারও আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।