এবার কোনো ভুল নয় লকডাউনে

আবারও নতুন করে ঘরে বন্দি হওয়ার সাইরেন বেজে উঠল বলে। করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হারও বেড়ে চলেছে হু হু করে। বিপন্নতা আর কোণঠাসার নতুন দৈব ডাক শোনা যাচ্ছে ঈশান কোণে। এইতো গত দু’দিন হলো সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের  সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী সোমবার থেকে সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন থাকবে। এর পিছনের কারণ হলো গত ২৯ মার্চ দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পুনরায় মাথা চাড়া দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সব অফিস ও কারখানা অর্ধেক জনবল দ্বারা পরিচালনা, উপাসনালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানা, জনসমাগম সীমিত করা, গণপরিবহনে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনসহ ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল সরকার। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে যে, সামনে হয়তো আরো দফায় দফায় লকডাউন থাকবে। আবারও ঘরের কোনে ঘাপটি মেরে দিনগুজরানোর সময় চলে এসেছে। বাইরে বের হলে বিপন্ন হবে জীবন আর ঘরে বসে থাকলে বিপদাপন্ন হবে সংসার। দুটোর অর্থই যেন এক। কিন্তু উপায়?

অবশ্যই উপায় রয়েছে। এবার আর আগের ভুল করা যাবে না। হেলায়-ফেলায় নন্দলাল হওয়ার দিন শেষ। অন্তত দুবেলা আধপেটা খেয়েপরে বেঁচে থাকার প্লান অ্যান্ড পলিসি করা লাগবে। তবে সেই পলিসি কেমন হবে সেসব আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

১) প্রথম ওয়েবে বাসায় এসে আমার পরিবারের সবাই মিলে হরেক রকম সবজি ও ধান চাষ করা শুরু করেছিলাম। হাতে কলমের দাগ আর মগজে ক্লাসের পড়াগুলো ভুলবার আগেই মাঠে নেমে পড়তে হয়েছিল। কাস্তে আর কোদালের জোরে গোটা পাঁচ-ছয় মাস সানন্দে  কেটেছিল? সুতরাং, এবারের লকডাউনে বাসায় এসেই চাষবাস আর গৃহে মুরগি,কবুতর ইত্যাদি চাষ করার পরামর্শ থাকবে। পুকুরে মাছ চাষ করলেও মন্দ না। এতে করে নিজেরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই মৌলিক চাহিদা বহুলাংশে মেটানো যাবে। যদি খাদ্যের জোগানটা নিজেরাই দেওয়া যায়, তাহলে বাকি সমস্যাগুলো গৌণ মনে হবে।

২) লকডাউনে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে হয় কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। হোস্টেল বা হলে অবস্থান করে নিজেরাই টিউশন করে যারা পড়াশোনার খরচ চালাতো এবং বাসায়ও খরচাপাতি দিত তারাই এখন বাসায় এসে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ এসে পড়ছে। কিন্তু প্রথম থেকেই যদি টিউশনটা অনলাইনে করে নেওয়া যায়, তাহলে বাসায় বসেও টাকা আয় করে পরিবারকে একটু হলেও সাহায্য করা যেতে পারে। অনলাইনে টিউশনির টুলস অ্যান্ড অভিজ্ঞতার ব্যাপারগুলো একটু আগেভাগেই ঝালাই করে নিলে ভালো হয়।

৩) গত লকডাউনে আগাম প্রস্তুতি নিয়েও কিছু ভুল ছিল। যেমন, বাসায় যাওয়ার সময় স্বল্প পোশাক নিয়ে যাওয়া কারণ সবাই ভেবেছে এটা তো সাতদিনই থাকবে। তারপর প্রয়োজনীয় বইপত্র হোস্টেলে বা হলে রেখে আসা ইত্যাদি। ব্যবসায়ীরাও কিছু ভুল করে বসেছিল। যেমন, আসন্ন চরম অবস্থা না বুঝেই ভুল করে বিনিয়োগ করে বসা, ঋণ করে ফেলা ইত্যাদি। এবার সব শ্রেণির মানুষেরই উচিত বুঝেশুনে ঘরে ফেরা। যাতে ঘরে ফেরার পর বিরাট কোনো আফসোস না পেয়ে বসে! এমনিতেই বিষণ্ন মন, তার ওপর আফসোস এসে আরো জ্বালা বাড়িয়ে দিবে।

৪) লকডাউনে যাওয়ার আগে থাকতে হবে আত্মোন্নতি মূলক কিছু পদক্ষেপ। যে কাজগুলো ঘরে বসেই দিব্যি করে ফেলা যাবে। যেমন, স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান, অনলাইন বিজনেস প্ল্যান, কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজ প্ল্যান ইত্যাদি। এসব করলে অবসর সময়টা যেমন আনন্দে কেটে যাবে, তেমনি করে আগামীর জন্যও নিজেকে আরেকটু প্রস্তুত করা যাবে।

৫) গত লকডাউনে আত্মহত্যা, ধর্ষণ, ব্যক্তিগত আক্রমণের  হারও অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছিল। এর থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। হতাশ হওয়া যাবে না, কারণ উপর্যুক্ত পদক্ষেপগুলো নিলে হতাশা লাঘব হবে। আর শারীরিক দূরত্ব বাড়লেই যাতে সামাজিক দূরত্ব না বাড়ে সেদিকেও নজর রাখা লাগবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জনগণ উভয়কেই এই এক্সট্রা মহামারির ব্যাপারে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

৬) লকডাউন ঘোষণা করলেই অনলাইন জগত্টা একটু চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তাই অবশ্যই নিজেকে এবং নিজেদের সন্তানদের অনলাইনের ব্যাপারে একটু সচেতন থাকা বিশেষ প্রয়োজন। অনলাইনে বুলিং, ক্রাইম, মিসইউজ ইত্যাদি থেকে সাবধান থাকা লাগবে। সবাইকে অবশ্যই আরো একটি জায়গায় নজর দিতে হবে যে, অনলাইনে ‘হতাশামূলক পোস্ট’ দেওয়া যাবে না। এসব পোস্ট সবাইকে আতঙ্কিত এবং বিপদাপন্ন করে দেয়। অনলাইনটা ঠিক থাকলে ঝামেলা আরেকটু কম হবে।

সমস্যা কাউকে বলে-কয়ে আসে না। আগাম প্রস্তুতিই পারে সেটার ধাক্কাকে মোকাবিলা করতে। লকডাউনের অন্যান্য বিধিনিষেধের পাশাপাশি আমাদের উচিত এই ব্যাপারগুলোও মাথায় রাখা, যাতে বিপদকে রুখে দিতে আমরা না হেরে যাই। সবাই মিলে করোনামুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা উচিত।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়