সিরিয়া সংকট এখনো কাটেনি

একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান সংকটের নজির হিসেবে সিরিয়ার সংকটের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। যে সংকটের অগ্নি প্রজ্বলিত হয়েছিল ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি, যার লেলিহান শিখায় ঝলসে গেছে লাখো সিরিয়ান মানুষের বর্তমানের আশা ও আগামীর আবেদন। এই সংকটের সূচনা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্তের নতুন রাজনৈতিক হাওয়া বদলের টানে, আর যার পিছনের গল্পে রয়েছে স্বার্থের দ্বন্দ্ব্ব, ধর্মীয় সংঘাত (শিয়া-সুন্নি সংঘাত), চরম বেকারত্ব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিকসহ অন্যান্য অধিকার ভোগে অনিশ্চয়তার মতো নানা দেশীয় কারণের জেরে শুরু হয় সিরিয়ান জনঅসন্তোষ। সরকারবিরোধীদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা ফ্রি সিরিয়ান আর্মি ও দ্য ডেমোক্রেটিক ফোর্সের মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রাম স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশব্যাপী, অচিরেই যা একটি গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। সেই সঙ্গে জন্ম হয় বিশাল এক শরণার্থী সংকট, এখন অবধি যার ভার বহন করতে হচ্ছে সিরিয়ার প্রতিবেশী ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে। সিরিয়ান এই সংকট হয়ে উঠেছে ইসলামিক স্টেটসহ অনেক মিলিট্যান্ট গ্রুপের উর্বর ভূমি।

অন্যদিকে এই গৃহযুদ্ধকে উত্তপ্ত করেছে বিদেশি শক্তির সমর্থন, যেখানে সিরিয়ান বাশার-আল-আসাদ সরকারের পক্ষে পূর্ণ সমর্থন মস্কো ও তেহরানের, অন্যদিকে সিরিয়ান বিদ্রোহী বা গণতন্ত্রকামী মানুষকে আশার মদদ যোগাচ্ছে আমেরিকা ও তার মিত্র সৌদি আরবসহ তুরস্ক। যা বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি করেছে নতুন শীতল যুদ্ধের আবহ। ২০১১ সালে বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার পুনঃ উত্থান, বহু মেরুকরণ ও নতুন শীতল যুদ্ধের সূচনার পরিচায়ক। সিরিয়ান ইস্যুতে বিদেশি শক্তির সমর্থন, এই সংকটকে করেছে দীর্ঘ এবং সেই সঙ্গে সংকটের বর্তমান পরিস্থিতিকে করেছে আরো জটিল। যার ফলে এই সংকট নিরসনে বিশ্বের স্বাধীন দেশসমূহের সর্ববৃহত্ সংগঠন জাতিসংঘসহ অন্যান্য গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ বা পদক্ষেপ (যেমন জাতিসংঘের উদ্যোগে সিরিয়ায় আনান-কমিশন; জেনেভা পিচ টক; ইউএস-লিড ইন্টারন্যাশনাল কলিশন) ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

 তাহলে এই সংকটের শেষ বা সমাধান কোথায়? প্রবাদে বলা হয়, সমস্যার মধ্যেই সমাধান অন্তর্নিহিত। যেহেতু সিরিয়ান সংকট শুরু হয়েছিল স্বৈরতন্ত্রী বাশার-আল-আসাদ সরকারের পদত্যাগ চেয়ে, তাই এই সংকট নিরসনকল্পে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হতে পারে সমাধানের এক আশার কল্পতরু। তবে সিরিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ কণ্টকাকীর্ণ, তাই এখানে কণ্টক হ্রাসে কিছু ছোট্ট পদক্ষেপ গ্রহণের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথমত, সিরিয়ান সংকট নিরসনে জাতিসংঘকে অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের দেশসমূহ সিরিয়ার ওপর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যসহ প্রয়োজনীয় ইস্যুতে অবরোধ জারি করতে পারে। তৃতীয়ত, সিরিয়া ইস্যুতে তীব্র বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা যেতে পারে, যার মাধ্যমে মস্কোসহ আসাদ মদদদাতাদের এই সংকটের সুষ্ঠু সমাধানের জন্য চাপ প্রদান করা যেতে পারে। চতুর্থত, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ বিশ্বব্যাপী একটি চরম মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে, যে সংকটে জাতিসংঘের রেসপনসেবলিটি টু প্রোটেক্ট (R2P) প্রয়োগের একটি সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। আর যা প্রয়োগের মাধ্যমে এই মানবিক সংকটের ইতি টানা যেতে পারে। পঞ্চমত, সিরিয়া যেসব আঞ্চলিক সংগঠন (যেমন, আরব লীগ; দ্য পার্লামেন্টারি অ্যাসেমবেলি অব দ্য মেডিটেরিয়ান; দ্য ইউনিয়ন ফর মেডিটেরিয়ান, দ্য গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল)-এর সদস্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, সেসব সংগঠনের সহযোগিতায় সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করা যেতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, যদি মস্কো চায় তাহলে সিরিয়ান সংকটের আশু সমাধান অত্যন্ত সহজ। কিন্তু এই সিরিয়ান সংকট নিরসনে, মস্কো ইস্যুই বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। সর্বোপরি, সিরিয়া সংকটকে রাজনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সমাধান করা যুক্তিযুক্ত।

n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ