প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল করে অবিলম্বে হেফাজতে ইসলামের বিচারের দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। গতকাল শনিবার সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে এই দাবি জানিয়ে তিনি বলেছেন, এরা নামে হেফাজতে ইসলাম। এরা ইসলামবিরোধী, জঙ্গি ও স্বাধীনতাবিরোধী। এরা রাষ্ট্রের শত্রু, দেশের শত্রু। এদের কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। এদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীকে আরো কঠোর হতে হবে। ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে তাণ্ডবের পর হেফাজতের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল, সেটিরও দ্রুত তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, কোনো সন্ত্রাসী-জঙ্গিরা ইসলামকে হেফাজত করতে পারে না। ইসলাম হেফাজত করবে আল্লাহ। হেফাজতের জঙ্গিরা যেসব মাদ্রাসা থেকে রাস্তায় বের হয়ে মানুষকে হত্যা করে, মানুষের বাড়িঘর ও স্থাপনায় আক্রমণ করে ও পুড়িয়ে দেয়; সেসব মাদ্রাসা বন্ধ করে দিতে হবে। ইসলাম কখনো সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিতে পারে না।
২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে শেখ সেলিম বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে থেকে বিভিন্ন স্থানে বিনা কারণে কী তাণ্ডব করেছিল। সেদিন খালেদা জিয়া বিএনপিকে হেফাজতের পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা বায়তুল মোকাররমে মসজিদে আক্রমণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আওয়ামী লীগ অফিসে আক্রমণ করে। এরা স্বাধীনতাবিরোধী, ইসলামবিরোধী।
একটি ছবি সংসদে দেখিয়ে শেখ সেলিম বলেন, এই জঙ্গিরা তলোয়ার নিয়ে ঘোড়ার ওপর উঠে পেছনে শত-শত জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র দিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা এবং স্থাপনা ধ্বংস করার জন্য তাণ্ডব চালিয়েছে। ছবি দেখে মনে হচ্ছে প্রাচীনকালের মতো কোনো যুদ্ধে যাচ্ছে, বিজয় করার জন্য। তাদের মনে রাখতে হবে—বাংলাদেশ তালেবান রাষ্ট্র নয়। এটা পাকিস্তান নয়। সন্ত্রাসী-জঙ্গিদের বাংলার মাটিতে কোনো স্থান নেই। সরকারকে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাধীন দেশে এভাবে চলতে পারে না।
২৪ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত বিএনপি স্বাধীনতা দিবসের সব কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে অভিযোগ করে শেখ সেলিম বলেন, কারা এধরনের কর্মসূচি বন্ধ করে? যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে তারা স্বাধীনতার কর্মসূচি ২৬ মার্চ বন্ধ করতে পারে? পারে না। বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। বিএনপি ২৬ মার্চ স্মৃতিসৌধে যায়নি। কারণ তারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না।
তিনি বলেন, বিএনপির নেতারা এখানে আছে। তাদের বাপ-দাদার হিসাব নেওয়া হোক। একাত্তরে তারা কোন দলে ছিল, শান্তিবাহিনীতে কারা ছিল। এর অনেক হিসাব আছে। এখানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আছেন, তাকে বলব এগুলো বের করে জনসম্মুখে প্রকাশ করুন।
পরে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির এমপি হারুনুর রশীদ বলেন, হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপিকে কেন জড়ানো হচ্ছে? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে বিএনপি কোনো বিরোধিতা করেনি। তিনি বলেন, যে বিষয়টি এই সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে এই প্রসঙ্গে জানতে চাই, আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কী থাকবে? ৫০ বছরপূর্তি আমাদের সুবর্ণজয়ন্তী, এই সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা লাশ উপহার দিলাম। আমরা কি শান্তিপূর্ণভাবে সারা বাংলাদেশের কোথাও সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে পেরেছি? এসময় সরকারি দলের সদস্যরা হইচই করে প্রতিবাদ জানান।
শেখ সেলিমের বক্তব্যের জবাবে হারুন বলেন, বিএনপি থেকে মোদিবিরোধী কোনো স্লোগান বা মোদি আসবেন না, এধরনের কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। যেহেতু ১৭ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় সব কর্মসূচি বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। করোনার সংক্রমণ বাড়ছে, সেহেতু বিএনপি জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও জিয়াউর রহমানের কবরে সীমিত আকারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে।
সরকারের উদ্দেশে বিএনপির এই এমপি বলেন, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ যারা করল, তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতেন। যখন ভাস্কর্য-মূর্তি নিয়ে দেশে একটি সংঘাতের তৈরি হলো, তখন হেফাজতের সঙ্গে তো সরকার আলোচনা করেছে। এর আগেও তো সরকার হেফাজতের সঙ্গে আলোচনা করেছে। আলোচনা করতেন যে বিদেশি মেহমানরা আসছেন, তোমরা আন্দোলন-বিক্ষোভ বন্ধ রাখো। সেক্ষেত্রে বিএনপিকে কেন জড়ানো হচ্ছে? হারুন আরো বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বন্ধ করে দিলে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ অবশ্যই সৃষ্টি হবে। সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক চর্চাগুলোকে মুক্ত করা দরকার। মতপ্রকাশের জায়গাগুলো আজ রুদ্ধ। সেই অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। আজকের সংকট হচ্ছে গণতন্ত্রের সংকট। এই সংকটের জন্যই আজ এই অবস্থা।