বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) করোনা ওয়ার্ডে আইসিইউ বেডের চরম সংকট চলছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য এ হাসপাতালে ১৫০টি বেড থাকলেও আইসিইউ রয়েছে মাত্র ১২টি। শেবাচিম হাসপাতালে মোট ২৮টি আইসিইউর ব্যবস্থা থাকলেও স্থায়ী চিকিত্সক না থাকায় করোনা ইউনিটে থাকা আইসিইউগুলো-ই চালু রয়েছে। ফলে অন্য রোগে আক্রান্তরা আইসিইউ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শেবাচিম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের শুরুতে আইসিইউ না থাকায় পরবর্তী সময় চিকিত্সক ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ হয়নি। স্থায়ী চিকিত্সক ও জনবল না থাকায় আইসিইউ থাকলেও সেবা পেতে অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের চিকিত্সক দিয়ে এবং কয়েক জন নার্সকে প্রশিক্ষণ দিয়ে করোনা ওয়ার্ডের আইসিইউ সেবা চালু রাখা হয়েছে। সেখানে কোভিড-১৯ রোগী ব্যতীত অন্য মুমূর্ষু রোগীরা সেবা পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র চিকিত্সাসেবার ভরসাস্থল এ শেবাচিম হাসপাতালে মোট ২৮টি আইসিইউর ব্যবস্থা থাকলেও স্থায়ী চিকিত্সক না থাকায় তার সুবিধা পাচ্ছেন না মুমূর্ষু রোগীরা।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকাল শনিবার দুপুর ২টা পর্যন্ত এ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিত্সাধীন ছিলেন ১১৮ জন রোগী। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২১ জনের। মোট ১২টি আইসিইউ বেডের সবগুলোই রোগীতে পরিপূর্ণ। আরো অন্তত ২০ জন আছেন যাদের জরুরি আইসিইউ সেবা প্রয়োজন। কিন্তু বেড না থাকায় তারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের আরটি পিসিআর ল্যাবে ১৭০ জনের নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩০ জনের। করোনা ওয়ার্ডের আইসিইউতে তিন শিফটে মাত্র তিন জন এবং করোনা ওয়ার্ডে তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন ১৫ জন চিকিত্সক। যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম বলে জানান হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. মনিরুজ্জামান। পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা কিংবা রোগীর ফুটফরমায়েশ খাটার জন্য এই ওয়ার্ডে নেই চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। পেটেভাতে নামমাত্র রোগীর সেবা করেন বহিরাগত অন্তত ২০ জন নারী। দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সামনে চলছে বহিরাগত সেবা। এ অবস্থায় রোগীর চাপ বাড়লে ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ২০২০ সালের মার্চে এ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে মারা যায় এক জন। রোগী ভর্তি ছিল আট জন। অথচ এই মার্চে করোনা ওয়ার্ডে মারা গেছে ৩২ জন এবং রোগী ভর্তি ছিল ৩৫১ জন। এমন পরিস্থিতিকে ভয়াবহ উল্লেখ করে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি। আগামীতে রোগীর চাপ বাড়লে করোনা ওয়ার্ডে মানবিক বিপর্যয় হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শেবাচিম হাসপাতালে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৭ সালে ১০ শয্যার আইসিইউ চালু করা হয়। জনবল না থাকায় দুই বছরের মধ্যেই ৩/৪ বার আইসিইউর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহূত না হওয়ায় ১০ শয্যার আইসিইউর সবগুলো ভেন্টিলেটরসহ যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে যায়। হাসপাতালের সদ্য সাবেক পরিচালক ডা. বাকির হোসেন গত বছর গুরুত্ব অনুধাবন করে সম্প্রতি সেগুলো মেরামত করে ব্যবহার উপযোগী করেন। পরবর্তী সময় করোনা পরিস্থিতিতে নবনির্মিত করোনা ওয়ার্ডে নতুন করে ১৮টি আইসিইউ বেড প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তী সময় অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের চিকিত্সক দিয়ে এবং ১০ জন নার্সকে প্রশিক্ষণ দিয়ে করোনা ওয়ার্ডের আইসিইউ সেবা চালু রাখা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, অনুমোদিত জনবল কাঠামোতে (অর্গানোগ্রাম) আইসিইউতে স্থায়ী জনবল পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য বিভাগের চিকিত্সকদের দিয়ে আইসিইউ সেবা চালু রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, ফেব্রুয়ারি মাসে বরিশাল বিভাগে করোনা আক্রান্তের হার প্রতি ১০০ জনের মধ্যে দুই থেকে তিন জনে নেমে এসেছিল। মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহে একই হার থাকলেও ১৫ মার্চের পর এর সংখ্যা ১২ থেকে ১৫ জনে চলে এসেছে। অর্থাত্ প্রতি ১০০ জনের পরীক্ষা করা হলে তাতে প্রায় ১৫ জন আক্রান্ত হচ্ছেন।