২০১০ সালে সাক্ষরতার হার ৫৮.৬, ২০১১ সালে ৫৮.৮ এবং ২০১২ সালে এসে সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬০.৭ শতাংশ। বিবিএসের জরিপ মতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার দাঁড়ায় ৭৪.৭ শতাংশ। যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখব, ভারতে সাক্ষরতার হার ৭৪.৪ শতাংশ, নেপালে ৬৬ শতাংশ, ভুটানে ৬৪.৯ শতাংশ। এছাড়াও আমাদের পেছনে আছে পাকিস্তান ৫৫ শতাংশ ও আফগানিস্তান ২৪ শতাংশ। একটি দেশের উন্নতি অনেকটা নির্ভর করে সাক্ষরতার মাপকাঠির ওপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বে টিকে আছে একাধিক কারণের মধ্যে একটি হলো শতভাগের কাছাকাছি সাক্ষরতার হার। শুধু তাই নয়, যার প্রায় সম্পূর্ণ শিক্ষিত সমাজকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পেরেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সারা দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। যার মধ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ১০ লাখ ৪৩ হাজার। বর্তমানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আরো বেশি। এত অধিকসংখ্যক শিক্ষিত বেকারের বোঝা মাথায় নিয়ে দেশ উন্নতির শিখরে এগোবে কি করে? প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকার দেশকে শিক্ষিত জাতি গঠনে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা প্রশংসার দাবিদার। সরকার সবাইকে শিক্ষার আলোতে আলোকিত করতে বিনা মূল্যে বই দিতে শুরু করে ২০১০ সাল থেকে। এতে এক দিকে সফলতা অর্জন করেছে সরকার। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করতে বিশাল এক সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু শিক্ষিত সমাজকে যদি আমরা কাজে লাগাতে না পারি তাহলে সেই শিক্ষিত সমাজ দিয়ে কি করব? আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকার যুবকের অভাব নেই। তাহলে সেই শিক্ষিত যুবসমাজ কি চাকরির যোগ্য না? নাকি চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা বেশি? কিন্তু বিভিন্ন ভাইভা বোর্ড থেকে একটি প্রশ্নই উড়ে আসে, আমরা যোগ্য প্রার্থী পাচ্ছি না। তাহলে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারছে না এটাই ইঙ্গিত করে। হাইস্কুল লেভেলের দিকে যদি তাকাই, তাহলে দেখতে পাব শিক্ষার্থীদের শুধু ঝোঁক থাকে ৭ম শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণিতে কোনো মতে পাশ করে ওঠার প্রবণতা। যেখানে কারিগরি শিক্ষার কোনো ছিটেফোঁটাও নেই। কলেজের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীদের মূল টার্গেট থাকে এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা, ভালো একটি ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া। সশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কোনো চিন্তাই তাদের মাথায় থাকে না। যেখানে তাদের কারিগরি শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠার কথা সেখানেই তারা পিছিয়ে পড়ছে। তাহলে দক্ষ জনশক্তির আশাকরি কি করে আমরা? আর আমরা কীভাবে চিন্তা করি দেশের উন্নয়ন তাদের হাতেই হবে? এবার ঘুরেফিরে উচ্চশিক্ষার দিকে নজর দিতে হবে, কি অবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর? বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় একটি জাতির মেরুদণ্ড। কারণ এখান থেকেই দেশের উন্নয়নের শক্তিশালী হাতিয়ার তৈরি হয়। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন ভিন্নতার ছোঁয়া। চাকরির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া। সারা রাত অ্যাসাইনমেন্ট করে, ল্যাব টেস্ট করে, ভালো রেজাল্ট করে বের হয়ে কি করতে হচ্ছে, সবশেষ চাকরির জন্য আবার আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। আর এর ফলে চাকরির বাজার থেকে ঝরে পড়ছে লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক। কিন্তু কেন চাকরির বাজারে আলাদা প্রস্তুতি? যদি গত্বাঁধা এক গাদি বই মুখস্থ করে সরকারি চাকরির জন্যই প্রস্তুতি নিতে হয় বিএসসি-অনার্স পাশ করার পর। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার প্রয়োজনটা কোথায়? সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। যে যে বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছে তাকে সেই সেক্টরের আলোর পথ দেখাতে হবে। চাকরির ক্ষেত্রে কোনো আলাদা পড়াশোনা নয়, চাকরির বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। বাইরের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের সেতুবন্ধন সৃষ্টি করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক লেভেলের কারিগরি শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়