বিশেষ প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করতে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসআই) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল রবিবার সকালে এনএসআইয়ের নবনির্মিত বহুতলবিশিষ্ট প্রধান কার্যালয় ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে ভার্চুয়ালি এই ভবন উদ্বোধনে অংশগ্রহণ করে বলেন, ‘আমি চাই এনএসআইয়ের প্রতিটি সদস্য দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালন করবেন। কর্তব্যপরায়ণতা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেই আপনারা আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতার নেতৃত্বে লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এদেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু ’৭৫-এর পর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বাংলাদেশকে বিচ্যুত করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার আমরা জাতির পিতার সেই আদর্শ ফিরিয়ে এনেছি। বাংলাদেশ আজকে সারা বিশ্বে একটা মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই মর্যাদা ধরে রাখা একান্তভাবে অপরিহার্য।’ তিনি এনএসআই সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘একটা বিষয় আপনাদের লক্ষ রাখতে হবে যে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি এবং এসব ব্যাপারে আপনাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে, যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের জানমাল রক্ষা করা এবং জনগণের জীবনের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় যা যা করণীয়, সেটা আপনাদের করতে হবে। এই সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক বা দুর্নীতির হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে, দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। সে বিষয়ে অবশ্যই আপনাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে, সেটাই আমি আপনাদের অনুরোধ করব।’
করোনা পরিস্থিতি বাংলাদেশের উন্নয়নে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করলেও এই অবস্থা থেকেও বাংলাদেশ উত্তোরণ ঘটাতে পারবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে এবং দেশের মানুষ যাতে নিজেদের আরো সুরক্ষিত করে, সেজন্য তাদের মধ্যে আরো সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তাই সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত ২০০৯ সালে আমরা সরকার গঠন করার পর থেকে এনএসআইয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় এনে অনেক নতুন পদ সৃষ্টি এবং সংস্থার জনবল দ্বিগুণ বৃদ্ধি করেছি। একইভাবে আগের মঞ্জুরিকৃত পদকে দ্বিগুণ করা হয়েছে। এনএসআই সদস্যদের কর্মস্পৃহা ও মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ সালের পরে বিভিন্ন পদে মোট ১৬০১ জনকে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে, যা ইতিপূর্বে কখনোই সম্ভব হয়ে ওঠেনি।’ তার সরকার এ সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন পদে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টির জন্য সমন্বিত নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন পদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে এবং বেতন স্কেল সমন্বয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, তার সরকার এনএসআইয়ের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশনের সুবিধা কার্যকর করেছে, যা আগে নির্দিষ্ট কিছু পদের কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সংস্থার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে ঝুঁঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে আপনাদের জন্য ৩০ শতাংশ বিশেষ ভাতা মঞ্জুর করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনবল ও কর্মপরিধি বৃদ্ধি পেলেও এনএসআইয়ের প্রধান কার্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান ছিল না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক কাজ ও স্পর্শকাতর গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে তার সরকার এর প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তদনুযায়ী তিনি ১৭ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে প্রধান কার্যালয় ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় এনএসআইয়ের নিজস্ব ভবন ছিল না উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার প্রধান কার্যালয় ছাড়াও সব বিভাগ ও জেলায় এনএসআই অফিসের জন্য জমি বরাদ্দের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে নিজস্ব জমিতে তিনটি বিভাগীয় কার্যালয় ও ২০টি জেলা কার্যালয়ের ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে ২১টি জেলা কার্যালয় ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। অবশিষ্ট জেলাগুলোতে দ্রুত কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এতে করে কর্মদক্ষতা বাড়বে, জনগণের নিরাপত্তা বাড়বে এবং গোয়েন্দা কাজের মধ্য দিয়ে যে কোনো তথ্য জোগাড় করাও সম্ভব হবে। গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রশিক্ষণের আধুনিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। বিষয়টি বিবেচনায় এনে আমরা জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের জন্য ঢাকার ধামরাইয়ে ৯ দশমিক ৫৬ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছি।’ তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের নতুন জনবল, যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অনুমোদন ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে এনএসআই সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদেরও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী এনএসআই সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ফলে দেশে অব্যাহত উন্নয়নের পরিবেশ বিরাজমান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী করোনার প্রথম দফা আগ্রাসনের মতো দ্বিতীয় দফায়ও এনএসআই সদস্যদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। গণভবন প্রান্ত থেকে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল টি এম জোবায়ের।