প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। সবকিছু আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা প্রথম এক সপ্তাহের জন্য ব্যবস্থা নিয়েছি এবং এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করেছি। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ করছি। লকডাউনে হয়তো মানুষের একটু কষ্ট হবে, কিন্তু জীবনটা তো আগে, আগে জীবনটা বাঁচাতে হবে।’ গতকাল রবিবার চলতি একাদশ সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ডাকা এই অধিবেশন মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্য দিয়ে শেষ হলো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা করোনা চিকিত্সার ব্যবস্থা করেছি। টিকার দ্বিতীয় ডোজ শুরু করব। আরো টিকা আনা হবে।’ হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হকের নাম উল্লেখ না করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ধর্মের পবিত্রতার কথা ও এত কিছু বলে অপবিত্র কাজ করে ধরা পড়েন। এই বিনোদনের এত অর্থ কোত্থেকে আসে? এটা দেশবাসী বিচার করবে। আইন আইনের গতিতে চলবে।’ তিনি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম পবিত্র ইসলাম ধর্মকে কলুষিত করছে। তাদের চরিত্র কেমন তা মানুষ দেখেছে। পারলারে কাজ করা এক মহিলা, তাকে বউ হিসেবে পরিচয় দেন। আবার নিজের বউয়ের কাছে বলেন যে, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমি এটা বলে ফেলেছি। যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেন, তারা এরকম মিথ্যা কথা বলতে পারেন? অসত্য কথা তারা বলতে পারেন? তারা তো মিথ্যা বলতে পারেন। কাজেই তারা কী ধর্ম পালন করবেন? মানুষকে কী ধর্ম শেখাবেন? কিছু লোকের জন্য ইসলাম ধর্মের বদনাম হবে, এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হেফাজতের সদস্যদের অনুরোধ করব, তারা যেন বুঝে নেন যে কোন নেতৃত্ব তাদের। জ্বালাও-পোড়াও করে তিনি বিনোদন করতে গেলেন সোনারগাঁওয়ের একটি রিসোর্টে। একজন সুন্দরী মহিলা নিয়ে। এরা ইসলাম ধর্মের নামে কলঙ্ক। ইসলাম ধর্মকে তারা ছোট করছেন। কিছু লোকের জন্য আজ এই ধর্ম জঙ্গির নাম, সন্ত্রাসের নাম। এখন তো যেই চরিত্র দেখাল, তাতে দুশ্চরিত্রের নামও জুড়ে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে ঘিরে যে সংঘাত-সহিংসতা হয়েছে, তাতে হেফাজতে ইসলাম একা নয়, তাদের সঙ্গে জামায়াত-বিএনপিও রয়েছে। হেফাজতকে তাণ্ডব, জ্বালাও-পোড়াওয়ের পরামর্শ দিয়েছে বিএনপি। সরকারপ্রধান বলেন, সরকার ধৈর্য ধারণ করেছে। কারণ সরকার সংঘাত চায়নি। তারা আগুন নিয়ে খেলছে। কিন্তু তাদের মাথায় রাখতে হবে, এক ঘর থেকে আগুন আরেক ঘরেও যেতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, হেফাজতের সবাই যে এর মধ্যে জড়িত, তা-ও কিন্তু নয়। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। হেফাজতে ইসলামের জ্বালাও-পোড়াও ঘটনার বেশ কিছু ছবি জাতীয় সংসদে দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘সবাইকে ধৈর্য ধরে এগোতে হবে। ধর্মের নাম নিয়ে অধর্মের কাজ জনগণ কখনো মেনে নেবে না। জনগণ কখনো সহ্য করবে না। পবিত্র ধর্মকে কেউ অসম্মান করবেন, সেটা আমরা চাই না। এ ধরনের অপকর্মে যারা জড়িত, আইনানুগ ব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২৬ মার্চ নরেন্দ্র মোদি আসবেন। তাকে আসতে দেওয়া যাবে না। বাধা দেওয়া কেন? আমার এই প্রশ্ন। আজ হেফাজতে ইসলাম কর্মসূচি দেয়। তারা কি দেওবন্দে যায় না শিক্ষা গ্রহণ করতে? তারা এসব ঘটনা যদি ঘটায়, তাহলে উচ্চশিক্ষায় দেওবন্দে যাবে কীভাবে? সেটা কী একবারও চিন্তা করেছে?’ তিনি বলেন, সরকার কওমি মাদ্রাসার সনদ দিচ্ছে। কারিকুলাম ঠিক করে দিয়েছে। তারা দেশ-বিদেশে যাতে চাকরি পান, তার ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। তার পরও তারা এই তাণ্ডব কেন ঘটালেন? তিনি বলেন, গুজব ছড়িয়ে ২৬ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে সহিংসতা চালানো হয়। ২৭ ও ২৮ তারিখ হেফাজতের পক্ষে বিএনপি-জামায়াতের বিবৃতি দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিক অংশ।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে, সেই সময় যে ঘটনাগুলো এখানে ঘটানো হলো এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয়, যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী আমরা উদ্যাপন করছি, সেই সময়ে আমাদের অনেক বিদেশি অতিথি আসছেন; অনেকে বার্তা দিচ্ছেন। সেই ব্রিটেনের রানি থেকে শুরু করে সৌদি আরবের বাদশা—সবার বার্তা আমরা পাচ্ছি। এত বড় একটা সম্মান বাংলাদেশ পাচ্ছে। সেখানে কারা খুশি হতে পারলেন না?’
সে সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস, দলীয় নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, সরকারি অফিস-আদালত ও গণপরিবহনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চিত্র সংসদে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখন আমার প্রশ্ন, ইসলাম তো শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্মের নামে এই যে জ্বালাও-পোড়াও, এটা কীভাবে আসল? তবে এটা নতুন কিছু না, ২০১৩ সালে আমরা দেখেছি এই বিএনপি-জামায়াত কীভাবে চলন্ত গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষকে পুড়িয়েছে, কীভাবে মানুষের ওপর আক্রমণ করেছে, সেগুলো আমরা দেখেছি। আজকে রেলস্টেশন থেকে শুরু করে ভূমি অফিস থেকে শুরু করে ডিসি অফিস থেকে শুরু করে সব জায়গায় যে আগুন দিয়ে বেড়াচ্ছে; তাদের মাদ্রাসা, তাদের বাড়িঘর, সেগুলোতেও যদি আগুন লাগে তখন তারা কী করবে? জনগণ কি বসে বসে এগুলো শুধু সহ্য করবে? তারা তো সহ্য করবে না।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘হেফাজতের এত জ্বালাও-পোড়াওয়ের পরেও পুলিশ কেন ধৈর্য দেখিয়েছে, সে প্রশ্ন এই সংসদে এসেছে। সরকার ধৈর্য দেখিয়েছে, কারণ কিছু করতে গেলে আরো সংঘাত হতো। আমরা সুবর্ণজয়ন্তী ভালোভাবে উদ্যাপন করতে চেয়েছিলাম।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণের স্মৃতি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ঐ অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছিলাম। সেই সময়কার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়াও যান। সেখানে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দেখে হাত বাড়ালেন, খালেদা জিয়া হাত গুটিয়ে বসে থাকলেন। কিন্তু সেই খালেদা জিয়াকে দেখলাম মোদি সাহেবের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করা ছবি। সেই হাত যেন আর ছাড়েনই না। তার সঙ্গে টেলিফোনে সেই খিলখিল করা হাসির আওয়াজ, সেটাও সবার কানে বাজে। আবার সুবর্ণজয়ন্তীতে যখন মোদি আসবেন, সেখানে বাধা দেওয়া। আর হেফাজতের সঙ্গে হাত মেলানো কেন? এ প্রশ্নের জবাব কোত্থেকে পাব জানি না। তবে এই প্রশ্ন রেখে গেলাম। আমি শুধু এটুকুই বলব, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।’