‘লকডাউন’ শব্দটি যেন নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের ওপরে আচমকা বজ্রপাত। গত বছর ২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরু হলে সংক্রমণ রোধে সরকার প্রথম বারের মতো লকডাউন জারি করে, এরমধ্যে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে শিথিল করা হয় লকডাউন। তবে সম্প্রতি নতুন করে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় সংক্রমণ ঠেকাতে ফের লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে; কিন্তু কতটা যৌক্তিক লকডাউন ঘোষণার সিদ্ধান্ত? গত বছরের লকডাউনে সৃষ্ট মানবিক সংকট কাটিয়ে ওঠার পূর্বেই নতুন করে লকডাউনের ঘোষণায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। লকডাউনের প্রভাব সর্বত্র বিরাজমান হলেও প্রথমেই চোখে ভেসে ওঠে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের করুণ দশার চিত্র। একদিকে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি অন্যদিকে আর্থিক টানাপোড়েন, ফলে একমাত্র জীবিকানির্ভর পরিবারগুলোতে নেমে আসবে চরম দুর্ভোগ। গত বছর দীর্ঘ সময় ধরে লকডাউনের ফলে মধ্যবিত্তরা নেমে এসেছিল নিম্নবিত্তের কাতারে। করোনার সংক্রমণ কিছু কমে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই ফের লকডাউন নিম্নমধ্যবিত্তের কাছে চরম অভিশাপ। একদিকে লাগামহীন দ্রব্যমূল্য ও অন্যদিকে লকডাউনে আয়ের পথ বন্ধ, ফলে দুইয়ে মিলে হাঁসফাঁস পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরিক্রমায় নিম্নমধ্যবিত্তরা। সমাজে উচ্চবিত্তের কাছে লকডাউন ভোগবিলাসিতার সুবর্ণ সময় হলেও নিম্নমধ্যবিত্তের কাছে এটি চরম অভিশাপের মতো। লকডাউন শুনেই সমাজে উচ্চবিত্তরা একসঙ্গে এক-দেড় মাসের অগ্রিম বাজার-ঘাট করে রেখে দেয়; কিন্তু সমাজে নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ কীভাবে জীবন পার করবে এই কঠিন সিদ্ধান্তে? একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষের মাথাপিছু দৈনিক গড় আয় ৫০০ টাকার কম। লকডাউনের ফলে কর্মহীন এসব মানুষের গতি কী হবে? কীভাবে বাঁচবে তারা? দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় লকডাউনের মতো কঠোর পদক্ষেপের ফলে এসব মানুষের ওপর ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে নেমে আসবে কঠিন বিপর্যয়। অতীতে লকডাউনে মানবিক সংকট ঠেকাতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, উচ্চবিত্ত ও সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ হলেও তা সংকট কাটাতে পর্যাপ্ত নয়। গত বছরের লকডাউনে অনেকে চাকরি হারিয়ে এখনো পর্যন্ত চাকরি পায় নি। আয়ের পথ বন্ধ হওয়ার ফলে মানসিক ভাবে অনেকেই ভেঙে পড়বে। মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে অনেকে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিতে পারে। করোনার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠছে আত্মহত্যা প্রবণতা।
জনসাধারণের সৃষ্ট সমস্যা আমলে না নিয়ে সরকারের লকডাউন ঘোষণা কতটা যৌক্তিক সেটি আরেকবার ভেবে দেখা উচিত। লকডাউনকে ঘিরে সরকারের সিদ্ধান্ত বারবারই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে| জনসমাগম ঠেকিয়ে করোনা রোধে সরকার গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বন্ধ রাখলেও চালু রাখছে বইমেলা। এছাড়া অফিস খোলা থাকলেও বন্ধ থাকবে গণপরিবহন। ফলে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত জনসাধারণের ভেতর ক্রমশ ক্ষোভ তৈরি করছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে লকডাউন দিয়ে জীবন বাঁচানো নাকি স্বাস্থ্যবিধি মেনে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ দেওয়া। এ দুটি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার ব্যাপারটি অবশ্যই সবার আগে বিবেচ্য; কিন্তু সমস্যা হলো লকডাউন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কর্মহীনতা ও দারিদ্রতা লাগামহীন হারে বাড়তে পারে। এছাড়া সামাজিক অস্থিরতা ও দুর্ভোগের চিত্র ফের নতুন করে দেখতে হবে| আমাদের দেশের মতো জনবহুল দেশে সাধারণ মানুষের আয়ের পথ বন্ধ করে হুট করে লকডাউনের সিদ্ধান্ত কোনো সমাধান হতে পারে না। সরকারের উচিত লকডাউন শিথিল করে চলাচল সীমিত করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। এছাড়া মাস্ক ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্ট চালু রাখার বিকল্প নাই। তবেই জীবন ও জীবিকার চলমান দ্বন্দ্ব একদিকে যেমন চুকে যাবে, অন্যদিকে সংক্রমণের গতি হ্রাস পাবে।
লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বন্দর কলেজ