স্বজনহারাদের আহাজারি আর আর্তচিত্কারের মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে শীতলক্ষ্যায় ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চটি উদ্ধার করেছে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে লঞ্চটিকে মাঝ নদী থেকে বন্দরের মদনগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে নিয়ে আসা হয়। তখন ভেতরে দেখা যায় কেবল লাশ আর লাশ। এ সময় স্বজনহারাদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। উদ্ধারকারী দল লঞ্চের ভেতর থেকে নারী-শিশুসহ ২২ জনের লাশ উদ্ধার করে। পরে নিমজ্জিত লঞ্চের কিছু দূরে আরো এক জনের লাশ উদ্ধার করে। বিকালে আরো এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত রবিবার রাতে পাঁচ নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। এ নিয়ে নিমজ্জিত লঞ্চের ২৯ যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়।
গত রবিবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে সদর উপজেলার চর সৈয়দপুর এলাকায় একটি কোস্টার জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চটি যাত্রীসহ ডুবে যায়। অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল থেকে মুন্সীগঞ্জে যাচ্ছিল। কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার সময় ১৫-২০ জন যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। লঞ্চ ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারের ঘটনার পর থেকেই বন্দর থানা ও বন্দর ফায়ার সার্ভিস কাজ শুরু করে। পরে এদের সঙ্গে যোগ দেয় বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড, দমকল বাহিনী, নৌ ও সদর থানা পুলিশের উদ্ধারকর্মীরা। এই মর্মান্তিক লঞ্চডুবিতে ছয়টি পরিবারে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই পরিবারের পাঁচ বোন বাবা-মাকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, ‘আমি বাবা কমু কারে, মা কমু কারে?’ মাথা চাপড়ে এভাবেই কাঁদছিল শীতলক্ষ্যার লঞ্চ দুর্ঘটনায় মা-বাবা ও ছোট বোন হারানো মাহিন। তার আহাজারিতে আশপাশে থাকা মানুষের চোখও ভিজে উঠছিল।
যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে যাদের নাম জানা গেছে তারা হচ্ছে, মুন্সীগঞ্জ সদরের নুড়াইতলী এলাকার মুখলেছের মেয়ে রুনা আক্তার (২৪), মোল্লাকান্দি চৌদ্দামোড়া এলাকার সমর আলী ব্যাপারীর পুত্র সোলেমান ব্যাপারী (৬০) ও তার স্ত্রী বেবী বেগম (৫৫), মালপাড়া এলাকার হারাধন সাহার স্ত্রী সুনিতা সাহা (৪০) এবং তার দুই পুত্র বিকাশ সাহা (২২), উত্তর চর মসুরা এলাকার অলিউল্লাহর স্ত্রী সখিনা (৪৫), একই এলাকার আরিফের স্ত্রী বিথি (১৮) ও তার মেয়ে আরিফা (১), মুন্সীগঞ্জ সদরের প্রীতিময় শর্মার স্ত্রী প্রতিমা শর্মা (৫০), মোল্লাকান্দি চর কিশোরগঞ্জের শামসুদ্দিন (৯০) ও তার স্ত্রী রেহেনা বেগম (৬৫), উজিরপুরের খায়রুল হাওলাদারের পুত্র হাফিজুর রহমান (২৪) এবং তার স্ত্রী তাহমিনা (২০) ও পুত্র আব্দুল্লাহ (১), দক্ষিণ কেওয়ার দেবীন্দ চন্দ দাসের পুত্র নারায়ণ দাস (৬৫) ও তার স্ত্রী পার্বতী রানী দাস (৪৫), বন্দর উপজেলার কল্যান্দী স্কুল এলাকার সোহাগের পুত্র আজমীর (১৫), মুন্সীগঞ্জ সদরের রিকাবিবাজার নূরপুর এলাকার মুশকে আলম মৃধার পুত্র শাহআলম মৃধা (৫৫), রতন পাতরের স্ত্রী মহারানী (৩৭), ঢাকার শনিরআখড়া এলাকার রশিদ হাওলাদারের পুত্র আনোয়ার হোসেন (৪৫), তার স্ত্রী মাকসুদা বেগম (৩০) ও মেয়ে মানসুরা (৭), নোয়াগাঁও পূর্বপাড়া এলাকার মিঠুনের স্ত্রী ছাউদা আক্তার লতা (১৮) ও লাতার বোন সাদিয়া (১১), শরীয়তপুর জেলার নরিয়ার মৃত নুরুন্নবী শেখের ছেলে আব্দুল খালেক (৭০), বরিশালের স্বরূপকাঠি এলাকার খাদিজা বেগম (৫০), ঝালকাঠির কাঠালিয়া এলাকার জিবু (১৩), বন্দরের সেলসারদি এলাকার নুরু মিয়ার ছেলে নয়ন (২৯) এবং একই এলাকার দোলা বেগম (৩৪)।
এছাড়া নিখোঁজ রয়েছে মুন্সীগঞ্জের মৃত সুনিতা সাহার অপর ছেলে অনিক সাহা (১২), মধ্য কোণ্ডাগাঁও এলাকার মতিউর রহমান কাজীর পুত্র ইউসুফ কাজী, ঢাকার মিরপুর-১১-এর বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের পুত্র মো. সোহাগ হাওলাদার, টঙ্গিবাড়ীর বেতকা এলাকার মুছা শেখের পুত্র জাকির হোসেন (৪৫), মৃত আনোয়ার ও মুন্সীগঞ্জ সদরের দক্ষিণ ইসলামপুরের মো. নুরুল আমিনের পুত্র মো. তানভীর হোসেন হূদয়, মালপাড়া এলাকার সিরাজের পুত্র রিজভী (২০)। এদিকে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেকে তাদের স্বজনদের খোঁজে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে আর্তনাদ করছিলেন আর স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে লঞ্চডুবিতে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি। গতকাল সোমবার প্রতিমন্ত্রী এক শোকবার্তায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী পৃথক বার্তায় অনুরূপ শোক প্রকাশ করেছেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম খান এ তথ্য জানান।