সড়কের মতো নৌপথে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। নৌ দুর্ঘটনা রোধে নানারকম উদ্যোগের কথা বলা হলেও যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। প্রতি বছরই লঞ্চ দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। গত ২২ বছরে সাত শতাধিক ছোট-বড় লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাণহানি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুর। প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়। বেশির ভাগ রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। কিছু কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না। দেখা গেছে নৌ দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে, তদন্ত করছে। কিন্তু ফল শূন্য। নৌ দুর্ঘটনা থামছে না। আবার ছোট ছোট দুর্ঘটনাগুলো কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি বলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত রবিবার শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির ঘটনায় অন্তত ২৯ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। লঞ্চডুবির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানপূর্বক এর দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবদুছ ছাত্তার শেখকে আহ্বায়ক করে এই কমিটি করা হয়েছে। কমিটি দুর্ঘটনাকবলিত নৌযান পরিদর্শন করে দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন এবং এজন্য দায়ী ব্যক্তি/সংস্থাকে শনাক্ত করবে। কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পেশ করবে। অন্যদিকে, লঞ্চডুবির ঘটনায় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ)। কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সব সময় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি দুর্ঘটনাকে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে। এখন কেউ যদি আইন না মানেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে সবাইকে সচেতনও হতে হবে।
নৌপথ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট লঞ্চকে বড় লঞ্চ ধাক্কা মেরে ডুবিয়ে দিল, এটা স্বেচ্ছাচারিতা। তার মানে যারা লঞ্চ চালাচ্ছেন তারা দায়িত্বশীল ও যোগ্য নন। তবে কমিটির রিপোর্ট বাস্তবায়ন হয় না বলে দুর্ঘটনাও বন্ধ হচ্ছে না। দুর্ঘটনা ঘটার পর ড্রাইভারকে শাস্তি দিলেই শেষ হয়ে যায় না। এটাকে ফলোআপ করার জন্য মনিটরিং গ্রুপ গঠন করলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মত বিশেষজ্ঞদের। প্রতিটি সরকারের সড়কমুখী উন্নয়ন কর্মকৌশল এবং নদীবিমুখ নীতির ফলে নৌপথে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। আইন প্রয়োগে অবহেলা ও নৌপথে সমন্বিত কার্যক্রমের অভাব, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনের অব্যবস্থাপনা, অস্বচ্ছতা, দুর্ঘটনা-দুর্যোগ এবং অক্ষমতা দুর্ঘটনার মূল কারণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণত ১৫টি কারণে বেশি লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন সংস্থা নানা সময়ে জরিপ করে এসব কারণ উদ্ঘাটন করে। কারণগুলো হলো লঞ্চের নকশাজনিত ত্রুটি, লঞ্চচালকের অদক্ষতা, মাস্টার-সুকানির গাফিলতি, ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ-তিন গুণ যাত্রী বহন করা, নিরাপত্তা আইন অমান্য করা, বাতি বা সার্চলাইট না থাকা, চলার পথে দুই লঞ্চের মধ্যে প্রতিযোগিতা, বেপরোয়া চালানো, আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে না জানা, পর্যাপ্ত লাইফ বয়া না থাকা, লঞ্চে কার্বন ডাইঅক্সাইড সিলিন্ডার না রাখা, লঞ্চের কারিগরি ত্রুটি, ফিটনেস না থাকা, উত্সবকালীন সম্ভাব্য দুর্ঘটনার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি না থাকা ও সতর্কতামূলক চিহ্ন ছাড়া মাছ ধরার জাল পেতে রাখা।
লঞ্চডুবির মতো দুর্ঘটনা খুব নিয়মিতভাবে হলেও, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে খুব সামান্যই। এখনো প্রচুর লঞ্চ রয়েছে ফিটনেসবিহীন, জীবন রক্ষাকারী যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই অধিকাংশ লঞ্চে। এছাড়াও দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েও এসব লঞ্চে যাত্রী পরিবহন করার অভিযোগ তো আছেই।