এক ছিল বন। সেই বনে থাকত এক কাঠুরে, তার স্ত্রী আর ছোট্ট একটা ছেলে। কাঠুরে সারা দিন যেখানেই থাকুক, সন্ধের আগেই তার বাড়ি ফিরে আসা চাই-ই। কারণ রাতের অন্ধকারে বিরান জঙ্গলে কোথায় কোন বিপদ ওত পেতে থাকে, তার কি কোনো ঠিকঠিকানা আছে? তাই বিকেলের মধ্যেই সে বাজারঘাট করে ফিরে আসে ঘরে। এভাবেই দিন কাটে। কিন্তু একদিন হঠাত্ কাঠুরের বাচ্চা ছেলেটা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। কাঠুরে আর তার বউ ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। কাঠুরে ঘর থেকে নেমে তাড়াতাড়ি বাজারের দিকে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে যে-ই না সে বাজারের কাছাকাছি গেছে অমনি দেখে ভালো কাপড়চোপড় পরা এক বুড়ো আর এক বুড়ি একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে।
একটু পরেই একটা ঘোড়ার গাড়ি এলো। বুড়ো-বুড়ি তাতে উঠে পড়ে। চালক যে-ই না গাড়ি চালিয়ে দিয়েছে, তখনই কাঠুরে দেখে, বেশ মোটাসোটা একটা কাপড়ের থলে পড়ে রয়েছে। নিশ্চয়ই তা বুড়ো-বুড়ির পোটলা থেকে পড়েছে মনে করে কাঠুরে সেখানে ছুটে যায়। তাড়াতাড়ি থলের মুখ খুলে দেখে, একগাদা সোনার মোহর ঝকমক করছে। কাঠুরে তো অবাক। কিন্তু বেশি ভাববার সময় কোথায়? ঘোড়ার গাড়ি যে ততক্ষণে বেশ দূরে চলে গিয়েছে।
থলে হাতে নিয়ে কাঠুরে রাস্তা দিয়ে ছোটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘোড়ার গাড়ির নাগাল পেয়ে যায়। সে গাড়ির কাছাকাছি গিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে—গাড়ি থামাও ভাই। গাড়ি থামাও...গাড়োয়ান ভাবে, ব্যাপার কী? সে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে গাড়ি থামায়। কাঠুরে গাড়ির সামনে এসে বুড়োকে বলে—এই যে হুজুর, আপনার থলে। গাড়িতে ওঠার সময় বোধহয় পড়ে গিয়েছিল। এই নিন।
বুড়ো তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে আসে। বুড়িও। সাধারণ পোশাকপরা একজন নিতান্ত গরিব মানুষ এতগুলো সোনার মোহর পেয়েও তা ফেরত দিতে এসেছে—এ কি মানুষ, না দেবতা? একটু সামলে নিয়ে বুড়ো বলে—হ্যাঁ, হ্যাঁ। এটা আমারই থলে। বুড়ো এই বলে কাঠুরেকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। তার বাড়ি কোথায়, কী করে, বাড়িতে কে কে আছে—এসব কথাও জিজ্ঞেস করে। কাঠুরে সব বলে। সে যে অসুস্থ ছেলের জন্য ওষুধ আনতে বাজারে যাচ্ছিল, তা-ও বলে। তারপর যে-ই না বাজারের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে গেছে, অমনি সেই বুড়ো খপ করে কাঠুরের হাত চেপে ধরে বলে—গাড়িতে ওঠো।
কাঠুরে কোনো দিশে পায় না। শেষমেষ বুড়ো তাকে হাত ধরে গাড়িতে ওঠায়। গাড়োয়ানকে হুকুম করে বাজারে যাওয়ার জন্য। তারা বাজারে কোবরেজের কাছে যায়। রোগের লক্ষণ বলে ওষুধ আর বাজার থেকে অনেক ফলমূল কেনার পর বুড়ো বলে—এবার হাঁকাও গাড়ি জঙ্গলের দিকে। আমরা কাঠুরের বাড়ি যাচ্ছি। বাড়িতে গিয়ে কাঠুরে দেখে, ছেলের অবস্থা আরো খারাপ। তখনই ছেলেকে ওষুধ খাইয়ে দেয়। একটু পর সবাই দেখে, ছেলে পিটপিট করে তাকাচ্ছে, আরো একটু পর জ্বর কমতে থাকে।
বুড়ো তখন বলে—এই যে বাবা, এই যে মা। এই জঙ্গলে আর থাকতে হবে না। এই কাঠুরের মতো ভালোমানুষ, সত্ মানুষ বিরান জঙ্গলে পড়ে থাকতে পারে না। শোনো, আমাদের কোনো ছেলেমেয়ে নেই। এখন থেকে এই মেয়েটি আমাদের মেয়ে আর কাঠুরে আমাদের জামাই। আর...আর এই যে ছোট্ট সোনাবাবু—এ আমাদের নানাভাই। আমার অনেক সম্পত্তি। সবই হবে তোমাদের। তোমরা এখনই আমার সঙ্গে যাবে আমাদের বাড়িতে।
বিদেশি উপকথার পুনর্কথন
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য