আচ্ছা, মানুষকে তো বলা হয় সৃষ্টির সেরা জীব। তবে মানুষ অত্যন্ত নাজুক প্রাণী, প্রতিকূল পরিবেশে অল্পতেই পটল তুলে ফেলে। কিন্তু এই পৃথিবীতে যদি সত্যিই মহাপ্রলয় নেমে আসে, পৃথিবী থেকে সবার আগে যেসব প্রাণী বিলুপ্ত হবে, তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে মানুষ। আর যেই প্রাণীটি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে তার নাম টার্ডিগ্রেড।
এক অতি বিস্ময়কর প্রাণী এই টার্ডিগ্রেড। এতটাই বিস্ময়কর যে, এই প্রাণীটিকে অনেকেই অন্য গ্রহের প্রাণী তথা ‘এলিয়েন’ বলে মনে করেন। কারণ, অসম্ভব সব প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে টার্ডিগ্রেডের মতো পৃথিবীর আর কোনো প্রাণীর এত বিপুল সহ্য ক্ষমতা নেই। কতখানি সহ্য ক্ষমতা আছে টার্ডিগ্রেড নামের বিস্ময়কর প্রাণীটির—আসুন জেনে নেওয়া যাক। টার্ডিগ্রেড দেখতে অদ্ভুত চেহারার। এর আটটি পা, তাতে আবার নখওয়ালা থাবা আছে। এদের দেখলে মনে হয় এটা এক ধরনের পতঙ্গ বা ইনসেক্ট। আকারের মাত্র অর্ধেক মিলিমিটার। কারণ, তারা সারা পৃথিবীর সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও এটা ছোট যে খালি চোখে দেখা মুশকিল। তা ছাড়া টার্ডিগ্রেড অনেকটাই স্বচ্ছ দেখতে। এজন্য জলের মধ্যে এদের খালি চোখে দেখতে পাওয়া খুব কঠিন। এদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করে দেখা গিয়েছে—পৃথিবীতে যত রকম মহাজাগতিক দুর্যোগ ঘটতে পারে, তার প্রায় সবগুলোই মোকাবিলা করে টিকে থাকার ক্ষমতা আছে এই টার্ডিগ্রেডের। তার প্রমাণ নানান ভাবে পাওয়া গেছে। যেমন ধরুন, সাধারণ চাপে ১০০ ডিগ্রিসেলসিয়াসে জল ফুটতে শুরু করে। এই তাপমাত্রায় যে কোনো প্রাণী মারা যাবে। কিন্তু টার্ডিগ্রেডরা ১৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও দিব্যি বেঁচে থাকে। এমনকি আগ্নেয়গিরি জ্তালামুখেও এরা বাস করতে পারে। টার্ডিগ্রেড বেঁচে থাকতে পারে ভয়াবহ ঠান্ডা পরিবেশেও। সেটা কত? আমরা জানি জিরো ডিগ্রি সেলসিয়াসে জল জমে বরফ হয়ে যায়। আর ‘পরম শূন্য’ তাপমাত্রা হলো মাইনাস ২৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। টার্ডিগ্রেডরা পরম শূন্য তাপমাত্রা থেকে মাত্র ১ ডিগ্রি বেশি অর্থাত্ মাইনাস ২৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও প্রায় ১৫ মিনিট বেঁচে থাকতে সক্ষম। আর মাইনাস ১০০ ডিগ্রিতে বেশ স্বাভাবিকভাবেই বেঁচে থাকতে পারে। মানুষ তো দূরের কথা এটা আর কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে চিন্তাও করা যায় না।
এ তো গেল ঠান্ডা বা গরম সহ্য করার ক্ষমতার কথা। টার্ডিগ্রেড কি প্রচণ্ড চাপও সহ্য করতে পারবে? পৃথিবীর সবচাইতে বেশি চাপ রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চে। এটা পৃথিবীর সমুদ্রের সবচাইতে গভীরতম অংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের স্বাভাবিক বায়ুচাপের তুলনায় এখানে চাপ ১০০০ গুণেরও বেশি! প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে এই চাপের পরিমাণ প্রায় ৮ টন। এতো উচ্চ চাপে যেকোনো জীবের প্রোটিন ও ডিএনএ ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়। অথচ টার্ডিগ্রেডরা এখানেও দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকতে পারে। এমনকি এর চেয়ে ৬ গুণ বেশি চাপেও টার্ডিগ্রেডরা বেঁচে থাকতে পারে। বেশ! ভয়াবহ চাপ না-হয় টার্ডিগ্রেডরা সহ্য করতে পারে।
কিন্তু যেখানে একদম কোনো চাপ নেই, ধরা ধাক মহাশূন্যে? সেখানেও কি শূন্যচাপে টার্ডিগ্রেডরা বাঁচতে পারবে? কী অবাক করা ব্যাপার! মহাশূন্যেও টার্ডিগ্রেডরা বেশ সহজেই বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি মহাশূন্যে রয়েছে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। সেই বিকিরণের হাজার ভাগের একভাগেই মানুষ মারা যাবে। অথচ এখানেও টার্ডিগ্রেডরা বাঁচতে পারে। নাসার উদ্যোগে ২০০৭ সালে কয়েক প্রজাতির টার্ডিগ্রেডকে পানিশূন্য অবস্থায় পৃথিবীর নিম্নকক্ষপথে প্রেরণ করা হয়েছিল। ১০ দিনব্যাপী মহাশূন্যের বিভিন্ন শক্তিশালী মহাজাগতিক তরঙ্গের বিকিরণের মুখোমুখি হওয়ার পর পুনরায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হয় উপগ্রহটিকে। দেখা যায় টার্ডিগ্রেডগুলো মারা যায়নি। নড়ে চড়ে বসলেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা।
পৃথিবীর কোনো প্রাণীই জল ছাড়া বাঁচতে পারে না। বলা যায়, জল হলো জীবন সৃষ্টির মৌলিক উপাদান। তাই বিজ্ঞানীরা এরপর জলবিহীন অবস্থায় টার্ডিগ্রেডদের পর্যবেক্ষণ করা শুরু করেন। অনেক বিজ্ঞানীই ধরে নিয়েছিলেন এবার হার মানবে টার্ডিগ্রেডরা। রটিফার নামক কিছু ক্ষুদ্র প্রাণী এর আগে জল ছাড়া কয়েক মাস বেঁচে থাকতে পেরে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল বিজ্ঞানীদের। কিন্তু টার্ডিগ্রেড মাসের হিসেবকে টেনে বছরে নিয়ে গেল। সেটা ১-২ বছর নয়, পুরো ১২০ বছর! অর্থাত্ টার্ডিগ্রেডরা শতাব্দীকাল পার করে দিতে পারে জল না পেয়ে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, টার্ডিগ্রেডদের দেহে জলের পরিমাণ ৮৫% থেকে নেমে ৩% হওয়ার পরও বেঁচে থাকতে পারে! সামান্য প্রাণী টার্ডিগ্রেড তখন প্রাণীজগতের ‘সুপারম্যান’ বনে গেল। বলা যায়, এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সকল জীবের সহনক্ষমতার তালিকা তৈরি করলে কোনো প্রাণী এর ধারেকাছে কেউ থাকবে না।
এ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রাণীর পাঁচবার গণবিলুপ্তি হয়েছে, এই বিলুপ্তির সবগুলোতেই টিকে থাকতে পেরেছে টার্ডিগ্রেডরা। নতুন করে পৃথিবীতে প্রাণীর গণবিলুপ্তি হলে সবার আগে মানুষ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু টার্ডিগ্রেডরা এর চেয়ে লক্ষ গুণ খারাপ অবস্থার ভেতরেও বেঁচে থাকতে পারবে। এজন্য বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে ভাবেন, টার্ডিগ্রেড কি অন্য গ্রহের প্রাণী?
n লেখক :সাংবাদিক