রিয়াদ হোসেন
করোনা ভাইরাসের টিকা প্রয়োগ শুরু হওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে গতি আসার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। ফলে রপ্তানিতেও প্রত্যাশিত গতি আসছে না। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে রপ্তানি বাড়েনি, কমেছে। এছাড়া গত মার্চে আগের বছরের মার্চের তুলনায় সাড়ে ১২ শতাংশ বেড়েছে। তবে গত বছর করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। ফলে সেই বিবেচনায় সদ্যসমাপ্ত মার্চে স্বাভাবিক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি আরো অনেক বেশি হওয়ার কথা। স্বাভাবিক অর্থনীতির বছর হিসেবে ২০১৯ সালের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ঐ বছরের মার্চের তুলনায় গত মার্চে রপ্তানি কমেছে আট শতাংশ।
গত বছরের মার্চ থেকে দেশে রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমতে শুরু করার পর জুন থেকে ফের উঠে দাঁড়াতে শুরু করে। কিন্তু নতুন করে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ফের উদ্বেগ শুরু হয়েছে। কয়েক জন রপ্তানিকারক জানিয়েছেন, গত বছরের মার্চের মতো সম্প্রতি রপ্তানি আদেশ পিছিয়ে দেওয়া কিংবা স্থগিত করে দিচ্ছেন ক্রেতারা। ফলে রপ্তানি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হলেও তা ফের পিছিয়ে যাবে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা। বেশ কয়েক জন রপ্তানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতিমধ্যে ইতালিসহ ইউরোপের কিছু দেশের করোনার ঢেউ শুরু হওয়ায় পুরো কিংবা আংশিক লকডাউন শুরু হয়েছে। ফলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও শুরু হয়েছে। আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি সার্বিকভাবে কমতে পারে (২০১৯ সালের বিবেচনায়)।
আগামী জুন নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতি স্বাভাবিক হবে বলে ইতিমধ্যে অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিলেও বর্তমানে সে অবস্থান থেকেও সরে আসছেন তারা। বরং বর্তমানে এসে এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আগামী দুই থেকে তিন বছরও লেগে যেতে পারে বলে মনে করছেন কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ।
ইপিবির হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে রপ্তানি করেছে ৩০৭ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য। আর গত বছরের মার্চে (করোনা শুরুর পর রপ্তানি কমার মাস) রপ্তানি হয়েছিল ২৭৩ কোটি ডলারের। সেই হিসাবে গত মার্চে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ। কিন্তু এর আগের বছর অর্থাত্ ২০১৯ সালে রপ্তানি হয়েছিল ৩৩৪ কোটি ডলারের। কিন্তু রপ্তানির পরিসংখ্যান তুলনা করতে স্বাভাবিক অর্থনীতির বছর বা ২০১৯ সালকে বিবেচনায় নিলে ২০২১ সালের তুলনায় রপ্তানি কমেছে প্রায় আট শতাংশ। এছাড়া চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম ৯ মাসে বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি করেছে ২ হাজার ৮৯৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম। আর ২০১৯ সালের সঙ্গে তুলনা করলে তা ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ কম।
দেশের রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতের রপ্তানিকারকরাও আগামী মাসগুলোতে আশার আলো দেখছেন না। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ওভেন পোশাক রপ্তানির অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ইতিমধ্যে কিছু ক্রেতা ক্রয়াদেশ না দিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করছেন। কেউ কেউ ক্রয়দেশ দেওয়ার পরও তা স্থগিত রাখতে বলেছেন। এছাড়া ক্রয়াদেশ এলেও আগের মতো বড় আকারে আসছে না। বরং ছোট ছোট লটে সীমিত লিড টাইমে (রপ্তানি আদেশের পর পণ্য জাহাজীকরণ পর্যন্ত সময়) পণ্য পাঠাতে বলছেন। এসব কারণে আগামী তিন মাসে তার রপ্তানি ২০১৯ সালের তুলনায় অন্তত ২০ শতাংশ কমতে পারে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসানও আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, করোনার টিকা প্রয়োগ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি স্বাভাবিক হওয়ার আশার কথা বলা হলেও বর্তমানে এসে দেখা যাচ্ছে পরিস্থিতি উলটো।
ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়া কিংবা আটকে যাওয়ায় নতুন করে তারল্য সংকটের আশঙ্কাও করছেন রপ্তানিকারকরা। এ পরিস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত ছোট উদ্যোক্তারা বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছেন। ফলে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান তাদের। তারা বলছেন, সরকার প্রণোদনার ঋণ দিলেও তা ছোট উদ্যোক্তাদের কাছে যায়নি। তাদের হাতে অর্থ পৌঁছানোর দিকে মনযোগী হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
অর্থনীতিবিদ ও ড. মুহম্মদ মাববুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে আরো দুই থেকে তিন বছর সময় লেগে যেতে পারে। ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট উদ্যোক্তাদের বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। অন্যদিকে বর্তমান বাস্তবতা মাথায় রেখে রপ্তানিকারকদের এ বিষয়টি মাথায় রেখে কৌশল ঠিক করতে হবে। ওষুধসহ যেসব পণ্যের চাহিদা থাকবে, ঐসব পণ্য রপ্তানিতে মনযোগ বাড়াতে হবে। এছাড়া বিশ্ববাজারে বর্তমান চাহিদার ভিত্তিতে পোশাক খাতসহ অন্যান্য খাতকে কৌশল ঠিক করার পরামর্শ দেন তিনি।