রাজশাহীতে সেই হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজে ফের অনিয়মের অভিযোগ

রাজশাহী মহানগরীর ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আলোকিত করতে ১৬টি ফ্লাডলাইট বসানো হয়েছিল। ৯ কোটি ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৭ টাকায় কাজটি বাস্তবায়ন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’। কাজটি শেষ করার পরই দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়ে প্রকল্পের নথিপত্র জব্দও করে। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’কে নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)।

তার পরও একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নগরীর বিলশিমলা থেকে কাশিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়কে সড়কবাতি বসানোর কাজটি পায়। গত রবিবার মৌসুমের প্রথম ঝড়ে ঐ সড়কে স্থাপিত ১৭৪টি সড়কবাতির মধ্যে অন্তত ৮৬টি হেলে পড়ে বা ভূপাতিত হয়। এ ঘটনায় একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে আবারও সমালোচনার মুখে পড়েছে রাসিক।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ১৬টি ফ্লাডলাইট বসানোর কাজে অনিয়মের বিষয়টি এখনো অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৯ সালের শেষের দিকে বসানো ফ্লাডলাইট প্রকল্পে ৬ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে গত বছরের ৪ অক্টোবর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আল-আমিনের নেতৃত্বে একটি টিম নগর ভবনে অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জব্দ করে। এদিকে স্থাপনের দেড় মাস পরই নতুন সড়কবাতির খুঁটিগুলো উপড়ে পড়ায় কাজে কোনো দুর্নীতি হয়েছে কি না, সেটি তদন্তের দাবি উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করছেন অনেকেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে চার লেন সড়কটির আইল্যান্ডে চীন থেকে আনা সড়কবাতির ১৭৪টি খুঁটি স্থাপন করা হয়। প্রতিটি খুঁটির সঙ্গে প্রজাপতির মতো ডানায় দুটি করে এলইডি বাতি বসানো হয়।

রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুত্ ও যান্ত্রিক) রেয়াজাত হোসেন রিটু জানান, সড়কবাতির খুঁটি একটি কংক্রিটের স্তম্ভের ওপর বসানো হয়েছিল। পাঁচ ফুট উচ্চতার স্তম্ভের সাড়ে তিন ফুট মাটির নিচে এবং দেড় ফুট মাটির ওপরে রয়েছে। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, কংক্রিটের স্তম্ভগুলোর কোনোটির উচ্চতাই পাঁচ ফুট হবে না। এগুলোর উচ্চতা সর্বোচ্চ তিন ফুট। এর অর্ধেক অংশ মাটির নিচে, বাকিটা ওপরে ছিল। মাটির নিচে কম থাকার কারণে মাত্র ৬৫ কিলোমিটার (ঘণ্টায়) গতিবেগের ধূলিঝড়ে খুঁটিগুলো উপড়ে পড়ে। রবিবার সরেজমিনে ৮৬টি খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত দেখা যায়। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই ক্রেন দিয়ে চেপে হেলে পড়া খুঁটিগুলো সোজা করার কাজ করছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সোমবার দুপুর পর্যন্ত ১৯টি খুঁটি সোজা করা হয়।

সূত্রমতে, সব খুঁটি তুলে কংক্রিটের স্তম্ভের পুরোটাই মাটির নিচে পুঁতে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন রাসিকের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। সোমবার সকালে খুঁটিগুলো পরিদর্শনে গিয়ে তিনি ঠিকাদারকে এই নির্দেশনা দেন বলে জানা যায়। উল্লেখ্য, খুঁটির স্তম্ভগুলো ভালোমতো না পোঁতায় আগেই সমালোচনা হয়েছিল। গত ২৮ জানুয়ারি কাজ চলমান অবস্থায় প্রবীণ সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহমেদ ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ শিরোনামে ফেসবুকে দুটি ছবি (একটি রাজশাহীর, অপরটি মালয়েশিয়ার) পোস্ট করেন। দুটি খুঁটি একই ধরনের। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমাদের মেয়র সাহেবের ভালো উদ্যোগগুলোতেও খুঁত থেকে যায়, রাসিকের প্রকৌশল শাখার কারণে। চমত্কার ডিজাইনের লাইটপোস্ট। তবে সৌন্দর্য নষ্ট করে দিচ্ছে চতুষ্কোণ কংক্রিটের ব্যাস, যার ভেতরে থাকবে ইলেকট্রিক ইউনিট। এটি অনায়াসে নিচু করে আংশিক ডিভাইডারের ভেতরে স্থাপন করা যেত না কি? মালয়েশিয়ার সড়কের ছবিটিতে তাই তো দেখলাম।’

তবে খুঁটিগুলো মাটির গভীরে না পোঁতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল হুদা টিটো। তিনি বলেন, খুঁটিগুলোর নিচের অংশে বাঁশের মতো নান্দনিক কারুকাজ করা আছে। তাই আরো পুঁতে দিলে সেটি আইল্যান্ডে ঢেকে যেত। সুন্দর জিনিসটা দেখানোর জন্য অল্প করে খুঁটি পোঁতা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, নতুন সড়কটার আইল্যান্ডের ভেতরে শুধু বালু। এ কারণে বাতাস সহ্য করতে পারেনি খুঁটিগুলো। আইল্যান্ডে বালুর পরিবর্তে মাটি থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না।’ তিনি স্বীকার করেন, পুরো কংক্রিটের স্তম্ভের দৈর্ঘ্য চার ফুট। অথচ রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী রেয়াজাত হোসেন রিটুর দাবি, পাঁচ ফুট।’