পুলিশের গুলিতে মৃত্যু ও জনৈক মাওলানার গ্রেফতারের গুজব ছড়িয়ে ফরিদপুরের সালথায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন, উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অফিস, উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবন, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন ও থানায় ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ সময় ইউএনও-এসিল্যান্ডের দুটি সরকারি গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয় তারা। এ ছাড়া তিনটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয় ও দুটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় জুবায়ের হোসেন (২০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। আট পুলিশ-র্যাব সদস্যসহ আহত হয়েছে অন্তত ৩০ জন। নিহত জুবায়ের উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামের আশরাফ আলী মোল্যার ছেলে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে নিহত জুবায়ের হোসেনের জানাজা শেষে লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এদিকে এই হামলা পরিকল্পিত উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ হাসিব সরকার বলেছেন, ‘পরিকল্পিতভাবে এই হামলা করা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র দেশকে অশান্ত করার জন্য এ ঘটনা ঘটায়।’ ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলিমুজ্জামান।
গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ উপজেলা চত্বরে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তাণ্ডব চালায়। তারা তিন ঘণ্টাব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। তাদের এই হামলায় রক্ষা পায়নি উপজেলা পরিষদ চত্বরের গাছপালা ও বঙ্গবন্ধুর মুর্যাল। এতে সালথা উপজেলা সদর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি অফিস, বাসভবন, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন ও থানার ভেতরের ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর চিত্র। উপজেলা পরিষদের চারতলা ভবনের নিচতলায় অন্তত ৫০টি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনওর বাসভবনের অন্তত ২০টি জানালার গ্লাস ভাঙচুর করা হয়। উপজেলা পরিষদের তিনটি গেট, ইউএনওর বাসভবনের একটি গেট, থানার একটি গেট ভাঙচুর করে ভেতরে প্রবেশ করে হামলাকারীরা হামলা ও বিক্ষোভ করে বলে জানা যায়। পিআইও অফিসের ত্রাণের মালামাল রাখার রুমে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বেশ কয়েক বস্তা চাল-ডাল, দুটি মোটরসাইকেল ও শতাধিক কম্বল পুড়িয়ে দেওয়া হয় বলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জানান।
যেভাবে হামলা :জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ফুকরা বাজারে লকডাউনের কার্যকারিতা পরিদর্শনে যান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা খান হিরামণি। এ সময় সহকারী কমিশনারের গাড়ি থেকে নেমে কয়েক ব্যক্তি বাজারে উপস্থিত কয়েক জনকে লাঠিপেটা করে। এতে পার্শ্ববর্তী নটাখোলা গ্রামের মো. জাকির হোসেন মোল্যাসহ কয়েক জন আহত হন। এতে জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে সেখানে সালথা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ পৌঁছালে উত্তেজিত জনতা তাদের ওপর হামলা করে। এতে মিজানুর রহমানের মাথা ফেটে যায়। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গুলিতে কয়েক জনের মৃত্যু ও স্থানীয় হেফাজত নেতা মাওলানা আকরাম আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছে—এমন গুজব ছড়িয়ে সালথা থানা অভিমুখে রওনা হয়ে থানা ঘেরাও করে। পরে একে একে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি অফিস, স্থাপনা ও বাসভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা।
এসিল্যান্ড মারুফা সুলতানা খান হিরামণি বলেন, তিনি রুটিন ওয়ার্কে বিভিন্ন বাজারে গিয়েছিলেন। এর অংশ হিসেবে ফুকরা বাজারে যান। সেখানে দুটি দোকান খোলা ছিল। এ সময় আমার পিয়ন গাড়ি থেকে নেমে তাদের দোকান বন্ধ করতে বললে দোকানের সামনে বসে থাকা লোকজন দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় জাকির পড়ে গিয়ে আহত হয়। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে স্থানীয় কিছু লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলে আমরা ফের গাড়িতে ওঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে চলে আসি। কাউকে পেটানোর কোনো ঘটনা ওখানে ঘটেনি।
সোনাপুর ইউপি চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান বাবু মোল্যা বলেন, বাজারে উপস্থিত স্থানীয়রা আমাকে জানান, সহকারী কমিশনারের গাড়ি থেকে নেমে একটি চায়ের দোকানের কাপ ভেঙে ফেলে। কাউকে মারধর করেছে এমন অভিযোগ কেউ করেনি।
প্রত্যক্ষদর্শী আবু নাসের হুসাইন বলেন, এর আগে এ ধরনের ঘটনা সালথার মানুষ কখনো দেখেনি। আমি প্রাণে বেঁচে গেছি। সন্ধ্যায় উপজেলা পরিষদে গিয়ে আটকে যাই। চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া দেখতে পাই। অন্য কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। কোনো রকমে দোতলা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পেছনের গেট দিয়ে পালিয়ে বের হয়ে আসি।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুজ্জামান বলেন, সেখানে পুলিশের ওপর হামলা করা হয়। এতে এসআই মিজানুর রহমানের মাথা ফেটে যায়। তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় তিন জনকে আটক করা হয়েছে।
সালথা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়াদুদ মাতুব্বর জানান, আমার বাসভবনসহ বিভিন্ন সরকারি অফিস ও থানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। তবে এই হামলার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতারা জড়িত। তারাই তুচ্ছ ঘটনাকে উসকে দিয়ে সালথাকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমপির কনিষ্ঠপুত্র শাহদাব আকবর লাবু চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, যারা হামলা চালিয়েছে তাদেরকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। সালথার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্রতিহত করা হবে।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৫৮৮ রাউন্ড শটগানের গুলি, ৩২ রাউন্ড গ্যাস গান, ২২ টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং ৭৫ রাউন্ড রাইফেলের গুলি ছুড়েছে পুলিশ। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আট সদস্য আহত হন। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’ এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। মানববন্ধনে বক্তারা হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান। এছাড়া জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ ঘটনার তিব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।