সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ক্রয়জনিত অসম নীতিমালার কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশীয় উদ্যোক্তা শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ। এতে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও শিল্পে সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব উদ্যোক্তা দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সাশ্রয় করছে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সরকারি ক্রয়নীতির অসামঞ্জস্যতার কারণে একই বা উন্নতমানের দেশি ব্র্যান্ডগুলো বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে পারছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অভ্যন্তরীণ উত্পাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি খাতে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে সরকার দেশীয় শিল্প খাতে নানা সুবিধা দিচ্ছে। এসব সুবিধার কারণে বেসরকারি খাত এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বমন্দা ও করোনার মধ্যেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যাচ্ছে। উত্পাদিত পণ্য রপ্তানিও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। তবে সরকার একদিকে সুবিধা দিলেও ক্রয়নীতির কিছুটা পরিবর্তন না করায় বিদেশি পণ্য চলে আসছে দেদার। আবার কোনো কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেরাই বিদেশি পণ্য প্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত রাখায় দেশি পণ্য পিছিয়ে পড়ছে, যা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের জন্যও হুমকিস্বরূপ। অথচ বিপুল জনসম্পদের এই দেশে অভ্যন্তরীণ চাহিদার পুরোটা জোগান দেওয়ার সুযোগ যদি দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ পায়, তাহলে মানসম্মত পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে উত্পাদন করে বিপুল বৈদেশিক মৃদ্রার অপচয় রোধ করে আরো ব্যাপক হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, “বাংলাদেশি পণ্য এখন আন্তর্জাতিক মানসম্মত বলেই রপ্তানি হচ্ছে।” উদাহরণস্বরূপ, দেশে প্যাসেঞ্জার লিফ্ট, কার্গো লিফ্ট, ইলেকট্রিক্যাল সুইচ-সকেট, ফ্যান, এলইডি লাইট-বাল্ব, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ-ডেস্কটপ কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল হোম এবং কিচেন অ্যাপ্লায়েন্স, এয়ারকন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর-ফ্রিজার, কম্প্রেশার, টেলিভিশনসহ নানা কিছু উত্পাদিত হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের এসব পণ্য আন্তর্জাতিক মানসম্মতই শুধু নয়, দামে সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। এসব পণ্যে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু দেশীয় এসব পণ্যকে বি গ্রেডভুক্ত বিবেচনা করছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত/আধা স্বায়ত্তশাসিত/ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দেশীয় ব্র্যান্ড বা উত্পাদনকারীরা তালিকাভুক্ত হতে সক্ষম হলেও কার্যত তারা সরকারি দরপত্রের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের শিল্পনীতিতে ‘আমদানি বিকল্প স্থানীয় শিল্পের উন্নয়ন’-এর কথা বলা হলেও বিভিন্ন সংস্থার বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী অধিকাংশ দরপত্রে দেশীয় ব্র্যান্ড বা দেশীয় উত্পাদনকারীর অংশগ্রহণের সুযোগ খুবই সীমিত। সরকারি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্রয়নীতিতে সরকারি মালিকানাধীন শিল্পের কিছু অগ্রাধিকার দেয়া থাকলেও বেসরকারি স্থানীয় শিল্পের উত্পাদিত মানসম্পন্ন সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্যের কোনরূপ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। অথচ ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস সেক্টরটি বর্তমানে এতই উদিয়মান যে, সরকারি ক্রয় নীতিতে একটু অগ্রাধিকার বা সমানাধিকারও যদি পায় তাহলেই অদূর ভবিষ্যতে এই সেক্টরটি আমাদের গর্বের আরএমজি সেক্টরকেও পেছনে ফেলবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। দেশিয় আমদানিকারক বা ট্রেডাররা ধাবিত হবে উত্পাদনে যেতে। প্রসার ঘটবে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের।
প্রায় সব সরকারি দরপত্রে বেশি দামের আমদানিকৃত পণ্যের ব্র্যান্ড বা দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ থাকায় দেশীয় ব্র্যান্ড বা উত্পাদনকারীরা সমমানের পণ্যের ক্ষেত্রে কম মূল্য প্রস্তাব করে দরপত্রে সমতুল্যের (ইকুইভ্যালেন্ট) বদৌলতে অংশ নিলেও কৌশলে বাদ পড়ে যায়। এতে সুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে দেশীয় উত্পাদনকারীরা বঞ্চিত হচ্ছে। এতে বিদ্যমান পিপিআর ২০০৮-এর বিধি ২৯(৩)-এর সরাসরি ব্যত্যয় ঘটছে। যেখানে বলা রয়েছে ‘কারিগরি বিনির্দেশে কোনো পণ্যের ট্রেডমার্ক বা পণ্যের ব্যাবসায়িক নাম পেটেন্ট, নকশা বা ধরন, নির্দিষ্ট উত্স দেশের নাম, উত্পাদনকারী বা সেবা সরবরাহকারীর নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা যাবে না।’ এবং উপবিধি (৪)-এ নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্যের বিবরণ উল্লেখ করার সুযোগ থাকলেও ব্র্যান্ড ও কোনো দেশের নাম উল্লেখ করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে তা-ই হচ্ছে। বিদ্যমান নীতিমালার অসামঞ্জস্যতা ও ফাঁকফোকরগুলো দূরীভূত হলে নতুন বিনিয়োগ যেমন উত্সাহিত হবে, তেমনি বিশ্ববাজারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের ব্যাপ্তি ও প্রসার আরো দ্রুততর হবে।
বাংলাদেশ এখন অনেক ক্ষেত্রেই ইলেকট্রনিকস শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এটার নেপথ্য কারন শিল্পায়নের জন্য সরকারের অকুণ্ঠ সমর্থন। বর্তমান সরকার শুরু থেকেই নীতি সহায়তাসহ নানান সুবিধা দেয়ার কারণেই আজ আমদানি বিকল্প একটি খাত হিসেবে ইলেকট্রনিকস শিল্পের বিসতার ঘটেছে। এক সময় ফ্রিজ, এসি বা ইলেকট্রনিকস পণ্য মানেই বিদেশি ব্র্যান্ড বা বিদেশি পণ্য বোঝাতো। পণ্যের যৌক্তিক মূল্য, গুণগতমান ও সহজ সার্ভিসের সক্ষমতার বিবেচনায় বেসরকারি পর্যায়ে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে মাইন্ডসেট পরিবর্তন হলেও সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে মাইন্ডসেট পরিবর্তন হচ্ছে না।
নিশ্চয়ই খেয়াল বা নীতিমালার ঘাটতির কারণেই এমনটি হচ্ছে। সরকারি কেনাকাটায় অতিতের রেওয়াজ চালু থাকায় আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করার জন্য আমাদের কর্মীরা শ্রম-ঘাম ঝরাচ্ছে, সেখানে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সরকারি কেনাকাটায় অযথা কেন খরচ হবে? এখন প্রায় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশীয় পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর সিক্রেট হচ্ছে আমরা মানসম্মত পণ্য উত্পাদন করে থাকি। তাহলে কেন মানহীন বিদেশি পণ্য দেশে আসবে? বৈদেশিক মুদ্রা সরকারি কেনাকাটায় অযথা কেন খরচ করা হবে? এক্ষেত্রে নীতিমালা পরিবর্তন জরুরি। আমরা আন্তর্জাতিক সব ধরনের মান সার্টিফিকেট অর্জন করেই বিদেশে পণ্য রপ্তানি করছি। অথচ মানহীন বিদেশি পণ্য কোনোরূপ দেশীয় মান সনদ ছাড়াই অবাধে দেশে প্রবেশ করছে। যেহেতু প্রতিটা দেশেরই বৈদ্যুতিক অবকাঠামো, জলবায়ু ও আবহাওয়া এবং পরিবেশ সংস্কৃিতি ভিন্ন, তাই সব দেশই আন্তর্জাতিক মান যা-ই থাক না কেন নিজস্ব নির্ধারিত মানকে প্রাধান্য দিয়েই তারা পণ্য আমদানি করে। একমাত্র আমরাই এক্ষেত্রে ব্যর্থতার সাথে ব্যতিক্রম। বর্তমানে দেশে ইলেকট্রনিকস অনেক পণ্যই আমদানি না করলেও চলে। আমাদের শিল্প সে সক্ষমতা অর্জন করেছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ দক্ষতা বা পারদর্শিতা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। এ কারণে আমদানিকারক দেশের কেউ আমাদের দেশের পণ্যের মান ও ফিনিশিং নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারছে না। এখন যেটুকু ঘাটতি আছে তা হলো আমাদের মানসিকতার। সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতায় এই শিল্প এতদূর আগাতে পারলেও নীতিনির্ধারকদের মানসিকতার পরিবর্তন হলে এখানে ইতিবাচক বিপ্লব হবে বলে বিশ্বাস করি।
এখন জরুরি দরকার প্রথমত, আন্তর্জাতিক মান সনদ যা-ই থাকুক না কেন দেশীয় মানসনদ (বিএসটিআই) ছাড়া কোনো পণ্যই যাতে অবাধে দেশে আমদানি হতে না পারে সে ব্যাপারে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। দ্বিতীয়ত, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পূর্ত অধিদপ্তরের সিডিউল অব রেটস্-এ দেশি-বিদেশি পণ্যের বিভাজন না করে, পণ্যের সঠিক মান সেট করে সে অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করে সিডিউল সংশোধন করা। এবং তৃতীয়ত, মানসম্মত দেশীয় শিল্প বা ব্র্যান্ডকে অগ্রাধিকার দিয়ে পিপিআর রুলস্-এ সংশোধনী আনা এখন সময়ের দাবি। তাহলেই সম্ভব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে ২০২৬ সনের অনেক আগেই দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে স্বার্থকভাবে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর।
লেখক : সদস্য, এফবিসিসিআই। উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন
দেশীয় পণ্য ব্যবহার সহায়ক নীতি
গ্রহণ করতে পারে সরকার
প্রফেসর ড. এম রফিকুল ইসলাম
ভাইস চ্যান্সেলর
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি
দেশীয় শিল্পকে সরকার যদি সহায়তা করে তাহলে তার মাধ্যমে কেবল ঐ শিল্পই লাভবান হবে বিষয়টি এমন নয়। তা সামগ্রিক সমাজকে লাভবান করে থাকে। সেদিক বিবেচনায় নিলে দেশীয় মানসম্পন্ন পণ্য ব্যবহারে সরকারের উদ্যোগ জনগণকে উত্সাহিত করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কোনো পণ্য কিনে, তখন দেশীয় মানসম্মত পণ্যের গুরুত্ব দেওয়া সমীচীন। তাহলে সাধারণ ক্রেতা যেমন দেশীয় পণ্য কিনতে উত্সাহিত হবে, তেমনি বিদেশিরাও আমাদের পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হবে। আল্টিমেটলি তাতে দেশই লাভবান হয়। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এখন প্রয়োজন সরকারি নীতি সহায়তা দেওয়া। এ খাতের জন্য কম সুদের ঋণের ব্যবস্থা করা। এজন্য রিজার্ভ ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। সেটা না হলে একসময় হয়তো বিপদে পড়তে হতে পারে। কারণ এখন ভালো থাকলেও সব সময় যে ভালো থাকবে বিষয়টা তেমন নয়। তাই টেকসই করার জন্য নীতিসহায়তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সরকার ইতিমধ্যে দেশীয় শিল্পগুলোকে বেশ সুবিধা দিয়েছে। বিপরীতে উদ্যোক্তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করেছেন। এখন আরো সামনে এগিয়ে যেতে হলে আরেকটু সুনজর দেওয়া উচিত। আর যদি মানের কথা বলা হয়, দেশীয় পণ্য মানসম্মত বলতেই হবে। আমাদের দেশে পণ্যের গুণগত মান ঠিক রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় একটি মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এ বিষয়ে কাজ করছে। এছাড়া দুইভাবে একটি পণ্যের মান রক্ষা করা হয়। প্রথমত, যে শিল্পকারখানায় পণ্য তৈরি হয়, তাদের নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে মান দেখা হয়। আর দ্বিতীয়ত, ঐ কোম্পানির বাইরে সনদপ্রাপ্ত তৃতীয় পক্ষ দিয়ে মান যাচাই করা হয়। এই মান যাচাইয়ে যদি দেশীয় পণ্য উতরে যায়, তাহলে তা কিনতে বাধা কোথায়?
বিদেশি পণ্য মানেই যে ভালো, তা কিন্তু নয়। বিদেশ থেকে আনা পণ্যগুলোকে বিএসটিআই কীভাবে সনদ বা ছাড়পত্র দিতে পারে সে বিষয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কারণ যেসব পণ্য দেশে আসছে কেউ জানে না যে সেগুলোর মাধ্যমে আমাদের পরিবেশের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না। এ কাজটি করার জন্য আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেখানে এ বিষয়ে গবেষণা হয় সেখানকার সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করতে যে যে নীতি নেওয়া দরকার তা সরকারকে নিতে হবে। সেটা করলে তা শুধু খাত সংশ্লিষ্টদের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য কাজে আসবে। তাই দেশীয় পণ্য ব্যবহারে সরকারের নীতিমালা গ্রহণ করা উচিত। দেশীয় পণ্য ব্যবহূত হলে একদিকে যেমন দেশীয় শিল্পগুলো রক্ষা হবে অন্যদিকে বাড়বে কর্মসংস্থান। এছাড়া দেশীয় পণ্য ব্যবহারে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
তারমতে, ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বেশি করে সম্পৃক্ত করা দরকার। তাতে দেশীয় শিল্প কারখানাগুলো উপকৃত হবে। পণ্যের মান অব্যাহত ভাবে বাড়বে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে বাস্তবিক কাজ করার সুযোগ পাবে। শিল্প এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুইয়ের মিশেলে ক্রমাগত গবেষণা কাজ চালিয়ে যেতে হবে। যেমনটি উন্নত বিশ্ব করে থাকে। সে সব দেশে গবেষণার স্বার্থে শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
আমদানির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট
নীতিমালা থাকা প্রয়োজন
অধ্যাপক ড. অলোক কুমার মজুমদার
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
বুয়েট
আমদানির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন ড. অলোক। তিনি বলেন, আমরা চাইলেই যে কোনো সময় যে কোনো কিছু আমদানি করতে পারি না। এজন্য ঐ পণ্যের গুণগত মান রক্ষার একটা বিষয় আছে। কারণ, সাধারণ নাগরিক একটা পণ্যের যথার্থ মান কতটুকু হবে তা বুঝতে পারেন না। তাই এ বিষয়ে সরকারের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানই মান ঠিক করে দেয়। ইলেকট্রনিকস পণ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন টেকনিক্যাল প্যারামিটার আছে। এগুলো যেহেতু বিদ্যুতে চলে তাই বিদ্যুত্সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যাপার আছে। পণ্যটি কতটা নিরাপদ সে বিষয় আছে। তাই এসব পণ্য আমদানির জন্য এসব বিষয় নিয়মে পরিণত করা এবং তা মানতে বাধ্য করার বিষয় আছে।
বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কিছু নীতিমালা আছে। সেগুলোর ক্ষেত্রে বিদ্যুত্সাশ্রয়ীর বিষয়টা বাধ্যতামূলক পর্যায়ে নয়। সেগুলো অপশনাল পর্যায়ে রয়েছে। এসি ও ফ্রিজের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এসব নিয়ম বাধ্যতামূলক করা যায় কি না সেটা বিবেচনা করার সময় এখন এসেছে। অবশ্য এক্ষেত্রে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দেশে এখনো ১০ থেকে ১৫ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তাই ঐসব নিয়ম যখন বাধ্যতামূলক করা হবে তখন গুণগত মান বাড়বে। সেক্ষেত্রে দাম যেন সুলভ হয় সে খেয়াল রাখতে হবে।
একইভাবে অন্যদিকও সত্য যে, মানহীন আমদানি পণ্যে বাজার ছেয়ে গেলে তা দেশের জন্য কোনোভাবেই ভালো না। এমন অবস্থার আরেকটা ভয়াবহ দিক আছে। সেটা হলো মানহীন পণ্যে দুর্ঘটনা বেশি হয়, পরিবেশের ক্ষতি করে। ভালো পণ্যও দীর্ঘদিন টিকবে না যদি সেটা যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয়। বেশির ভাগ পণ্যই রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। একটা টিভি যেমন রক্ষণাবেক্ষণ না করে চালানো যায় একইভাবে কিন্তু ফ্রিজ বা এসি চালানো যায় না। রক্ষণাবেক্ষণের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য বড় বড় কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য কোম্পানিগুলোর সামাজিক দায়িত্ব থাকতে হবে। খুলতে হবে আলাদা বিভাগ। যে বিভাগের কাজ হবে মানুষকে সচেতন করা। কারণ আমাদের দেশে কোনো পণ্য দুই বা পাঁচ বছরেই নষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ঐ পণ্যের গুণগত মান যে খারাপ তা নয়। পণ্যটি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভ্যাস গড়ে তোলা যায় সে বিষয়ে ড. অলোক বলেন, ভোক্তাদের বোঝানো যে আপনি পাঁচ বছর এটা রক্ষণাবেক্ষণ করবেন তাতে খুব বেশি খরচ হবে না। প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা লাগবে যা আপনি কোম্পানিকে দিবেন। কোম্পানি তার নিজস্ব লোক দিয়ে কাজটি করে দেবে। এতে উভয় পক্ষই লাভবান হবে। কোম্পানির যেমন সুনাম বাড়বে আর ভোক্তার পণ্যটিও দীর্ঘদিন সুরক্ষিত থাকবে। যে কোনো দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচা যাবে।
ইলেকট্রনিকস খাতে গ্রাম ও শহরের সার্ভিস বিষয়ে এ অধ্যাপক বলেন, এখানে প্রায় ৫০ হাজারের মতো লোক কাজ করেন। যাদের কেবল অভিজ্ঞতা আছে। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা নেই। ইলেকট্রনিকস পণ্য যেহেতু দ্রুত বদলে যায় তখন ঐ মফস্সল শহর বা গ্রামের টেকনিক্যাল ব্যক্তিটি ঐ পণ্যটি মেরামত করতে পারে না। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতাকে এক জায়গায় করতে পারলে বেশি সফলতা পাওয়া যাবে। মানহীন বিদেশি পণ্য না এনে মানসম্মত দেশীয় পণ্য ক্রয়ে সরকারের প্রাধান্য ধাকা উচিত।
দেশীয় পণ্য ব্যবহারের বিষয়ে
মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে
আর এন পল
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
আরএফএল গ্রুপ
দেশীয় পণ্য ব্যবহারের বিষয়ে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যখন সরকারি কোনো প্রকল্পের জন্য কোনো পণ্য কেনার প্রসঙ্গ উঠে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি পণ্যটি বাছাই করা হয়। গুণগত মান একই হলেও বিদেশি পণ্যটি বাছাই করা হয়। বিদেশি পণ্যগুলোকে এ গ্রেড এবং একই মানের কম মূল্যের দেশীয় পণ্যকে বি গ্রেড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের যদি এভাবে দেখা হয় তাহলে আমরা কিভাবে শিল্পে সক্ষমতা অর্জন করব।
আমরা সংখ্যায় যদি আরো বেশি উত্পাদন করতে পারি, তাহলে আরো বেশি রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এজন্য বড় বড় কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসছে। আরো এগুতে হবে। আর সরকারকে সহায়তা দিতে হবে। কেউ কেউ বলে সুবিধা দিলে বড় কোম্পানিগুলো ছোটদের খেয়ে ফেলবে। এটা ঠিক নয়। বড় কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা বড়দের সঙ্গে আর ছোটদের প্রতিযোগিতা ছোটদের সঙ্গে। এখন দেশীয় কোম্পানিগুলোকে সহায়তা দিলে আমাদের বিদেশি বিনিয়োগ না হলেও চলবে। কারণ, এখন দেশীয় কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা অনেক বেড়েছে।
প্রকৃত বড় কোম্পানিগুলোকে আলাদা করতে হবে। তাদের জন্য আলাদা সুযোগও তৈরি করতে হবে। তাহলে খাতভিত্তিক উন্নয়ন করা সহজ হবে। আর আরেকটি বিষয় ব্যাক ওয়ার্ড লিংকেজেকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। বড় বড় কোম্পানিগুলো অন্য দেশের কোম্পানি থেকে প্রযুক্তি নিয়ে এসে দেশে ইন্ডাস্ট্রি করে। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা না পেলে ঐ শিল্প ধরে রাখা যায় না। এজন্য শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে সেভাবে নীতি সহায়তা দিতে হবে।
বাংলাদেশ একসময় কাপড় সেলাই দিয়ে শুরু করে আজ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্ট পণ্যের সরবরাহকারীর মর্যাদা অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে মেইড ইন বাংলাদেশ এখন বিখ্যাত হয়ে গেছে। বর্তমানে দেশে হাইরাইজ বিল্ডিং বাড়ছে। এসব বিল্ডিংয়ে ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস বা ইলেকট্রম্যাকানিক্যাল পণ্য দরকার। একসময় লিফটের চাহিদার পুরোটাই আমদানিনির্ভর ছিল।
আমাদের মতো বেশ কিছু বড় কোম্পানি এখন দেশেই ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডের লিফট বানাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে উত্পাদন হওয়ায় লিফটের দাম কমে যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি কেনাকাটা বা পিপিআরের মাধ্যমে যে ক্রয় করা হয় সেক্ষেত্রে নীতির কিছু পরিবর্তন করা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, সর্বোপরি বিদেশি পণ্য বেশি দামে কেনার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। পণ্য কেনার সময় তার গুণগত দিককে বেশি বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে বর্তমানে দেশে মানসম্পন্ন পণ্য উত্পাদিত হচ্ছে বলেই রপ্তানি বাড়ছে। দেশীয় পণ্যের কদর বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগও বেড়েছে।
দেশীয় পণ্যকে উত্সাহিত করতে নেয়া সহায়ক পদক্ষেপ প্রকারান্তরে দেশের কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এভাবেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে উন্নত দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নামে ‘স্টিকার
প্রোডাক্ট’ বিক্রি করছে কেউ কেউ
আবু তারিক জিয়া চৌধুরী
পরিচালক
যমুনা ইলেকট্রনিক্স লি.
আমরা বিভিন্ন পণ্য উত্পাদন করছি। সেটার গুণগত মান রক্ষা করেই করা হচ্ছে। তবে সরকারি কেনাকাটা ও সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্য প্রাধান্য পাচ্ছে না। এমনকি বিভিন্ন শর্ত দিয়ে এমন অবস্থা করা হয় যে দেশীয় পণ্য উত্পাদনকারীরা অনেক টেন্ডারে অংশগ্রহণই করতে পারে না।
তিনি বলেন, এসব কেনাকাটা প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নামে যারা অংশ নিচ্ছেন তারাও আসলে অধিকাংশই মানসম্মত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড না। এগুলো অনেকাংশেই আসলে ‘স্টিকার প্রোডাক্ট’। এতে যেটা ঘটছে তা হলো পণ্য কেনার কিছুদিন পরে সেটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে সরকার দুই দিক থেকেই লোকসানে পড়ছে। একদিকে যেমন দেশীয় শিল্পগুলো উঠতে পারছে না। এতে দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে না। আর অন্যদিকে দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকা নষ্ট হচ্ছে খারাপ পণ্যের কারণে।
সরকারি কেনাকাটায় সরকারকে একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে যেখানে, পণ্যের গুণগত মান ঠিক থাকলেই উত্পাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বা কান্ট্রি অব অরিজিন বাংলাদেশ শর্ত দিতে হবে। সেটা করা গেলে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করার সক্ষমতা বাড়বে। তাহলে আমাদের উত্পাদনক্ষমতার পুরোটাই কাজে লাগাতে পারব।
বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব পণ্য উত্পাদন হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে কোনো অংশে কম নয়। আর এসব পণ্য আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই উত্পাদন হচ্ছে। এ কারণেই এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশীয় ইলেকট্রনিকসের পণ্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এশিয়ার দেশগুলোতে যাচ্ছে। ইউরোপের অনেক দেশেও পণ্য যাচ্ছে। আমাদের দেশের পণ্যের মান ভালো না হলে তারা কখনোই আমদানি করত না। একইভাবে স্থানীয়ভাবেও যদি আমরা ভালো পণ্য না দিই তাহলে মানুষ তা কিনবে না। আমাদের ব্যবসাও থাকবে না।
তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো ভালো মানের ইলেকট্রনিকস পণ্য উত্পাদন করছে। দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে আমাদের দক্ষতা অনেক বেড়েছে। এখন এ খাতের আরো বেশি উন্নয়ন ও সামনে এগুনোর জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। সেটা না হলে কোনো দেশেই কোনো খাত এগুতে পারে না। এজন্য সরকারের পলিসিতে দেশীয় পণ্যের স্বার্থ সংরক্ষণ হয়, এমন নিয়ম যুক্ত করতে হবে। দেশীয় পণ্য হওয়ায় আমরা কম দামে পণ্য বিক্রি করছি এর অর্থ এই নয় যে, পণ্যের মান খারাপ। তাই সরকারি কেনাকাটায় যাতে আমরা অংশ নিতে পারি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে আমাদের পণ্য দিতে পারি সে ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। পণ্যের মানের নিশ্চয়তা আমরা দিচ্ছি। সরকারি মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা তা নিশ্চিত করবে।
বিদেশি পণ্যের প্রতি আমাদের দেশের অনেক মানুষের একটা মাইন্ডসেট আছে। অথচ বিদেশি মানহীন পণ্যের চেয়ে স্থানীয় অনেক কোম্পানি এখন ভালো পণ্য উত্পাদন করছে। তাই মানসিকতা পরিবর্তন হয়ে গেলেই আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব।