নির্বাচনে সহিংসতা এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের ম্যাজিক

ভারতকে বলা হয় বৃহত্তম জনসংখ্যার গণতান্ত্রিক দেশ। সেই দেশটিতে বর্তমানে পাঁচটি রাজ্যে বিভিন্ন দফায় বিধানসভা নির্বাচন চলিতেছে। এই নির্বাচনে আমরা আমাদের প্রতিবেশী ভূখণ্ড পশ্চিমবঙ্গের দিকে দৃষ্টি দিয়া প্রতিনিয়তই বিস্ময়াভিভূত হইতেছি। নির্বাচনে বাগ্যুদ্ধ কাহাকে বলে, উহা কত প্রকার ও কী কী—তাহার চক্ষু ছানাবড়া করা উত্তর মিলিবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে। গ্রামবাংলায় একটি কথা প্রচলিত আছে—‘হাত’ থাকিতে ‘মুখে’ কী? এই হাতাহাতির তীব্র প্রয়োগও দেখা যাইতেছে এইখানকার নির্বাচনে। হকিস্টিক হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন লাঠিসোঁটা এবং ধারালো অস্ত্রের আস্ফাালন আর বোমাবাজি তো আছেই, রক্তের স্রোতও কম বহিতেছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতে পারে—‘ওরে বাবা! এ কেমন নির্বাচন!’

একটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন এইভাবে সহিংস হইয়া উঠিতে পারে এবং শত শত হুমকি-প্রতিহুমকি এতখানি আপত্তিকর ভাষায় উচ্চারিত হইতে পারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য নেতার নিকট হইতে—তাহা বিস্ময়কর বটে। তথ্যপ্রযুক্তির বৈপ্লবিক এই যুগে পশ্চিমবঙ্গের সংবাদ চ্যানেল ও পত্রিকা ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সকল বিস্ফোরক আচরণ ও সহিংসতার ঘটনা আমরা বাংলাদেশে বসিয়াও প্রতিনিয়তই জানিতে পারিতেছি। আর যতই তাহা জানিতেছি এবং দেখিতেছি, ততই মনে হইতেছে—পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের মতো সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা যদি বাংলাদেশের নির্বাচনে ঘটিত, তাহা হইলে কী হইত? নির্বাচনকে শিকায় তুলিয়া এই ঘোলা পানিতে অন্য কোনো শক্তি কি মাছ ধরিতে চাহিত না? এই জাতীয় ঘোলা পানিতে মাছ ধরিবার ইতিহাস তো বাংলাদেশের আছে।

কিন্তু রক্তস্রোত বহিলেও ভারতে কী করিয়া গণতন্ত্রের পিদিম নিভে না কখনো? ইহা বুঝিবার পূর্বে সংক্ষেপে বলিয়া রাখা ভালো, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাস খুব নূতন নহে। পশ্চিমবঙ্গ হইতে প্রকাশিত একটি গ্রন্থ হইতে জানা গিয়াছে, রাজ্যটিতে ১৯৭৭ হইতে ২০১০ সালে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছেন প্রায় ৪ হাজার মানুষ। ইহা ছাড়াও বিংশ শতাব্দীর ছয় ও সাতের দশকে নকশাল আন্দোলনের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা গিয়াছে এই রাজ্যটিতে, যাহার সুস্পষ্ট কোনো হিসাব নাই। একটি দৈনিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ১৯৯৮ হইতে ২০২০ সালের শেষাবধি তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি অনুযায়ী তাহাদের সহস্রাধিক কর্মী মারা গিয়াছেন। সিপিআইএম জানাইয়াছে, ২০০৯ সালের মে মাস হইতে ২০১৯ সালের নভেম্বর অবধি তাহাদের ছয় শতাধিক কর্মী নিহত হইয়াছেন। পক্ষান্তরে বিজেপির তরফে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত ফেব্রুয়ারি মাসে বলিয়াছেন, পশ্চিমবঙ্গে তাহাদের ১৩০ জনের অধিক কর্মীকে হত্যা করা হইয়াছে।

নির্বাচনের সময় এই সহিংসতা আরো বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কেন নির্বাচনের সময় সহিংসতা বৃদ্ধি পায়? ইহার উত্তর খুঁজিতে কয়েক বত্সর পূর্বে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত হইয়াছিল ‘হোয়াট মেকস সাম ইলেকশনস ভায়োলেন্স?’ নামের একটি প্রবন্ধ। সান ডিয়েগো ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এমিলি এম হ্যাফনার-বার্টন, ইয়েল ইউনিভার্সিটির সুসান ডি. হাইড এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সাইন্সের রাইয়ান জ্যাব্লনস্কি নামের দুই গবেষক এই প্রবন্ধে জানান, যখন কেহ বা কোনো দল ক্ষমতা হারাইবার ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করেন কিংবা ক্ষমতা অর্জনের ব্যাপারে মরিয়া হইয়া উঠে—তখন সহিংসতা মাথাচাড়া দিতে পারে। তাহা ছাড়া, শাসনপ্রণালিতে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতায় সহিংসতা করিয়া পার পাইয়া যাইবার সুযোগ থাকিলেও হিংসাত্মক ঘটনা বৃদ্ধি পাইয়া থাকে।

এখন প্রশ্ন হইল, সহিংসতার শতসহস্র ঝড়ঝাপটা সত্ত্বেও ভারত তাহার ‘গণতন্ত্রের’ প্রদীপকে কেন নিভাইতে দেয় না? সেইখানে সহিংসতা ছাড়াও কালোটাকার খেলা আছে, সাংসদ-বিধায়ক তথা ‘ঘোড়া কেনাবেচা’ আছে। আধাসামন্তবাদী সমাজ হইতে ভারত তো এখনো পুরোপুরি মুক্ত নহে। তাহা হইলে ‘ভারতীয় গণতন্ত্রের’ ম্যাজিকটা কোথায়? প্রকৃতপক্ষে, পশ্চিমা গণতন্ত্র হইতে ‘ভারতীয় গণতন্ত্রের’ বিশেষ তফাত রহিয়াছে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় ভারতের শতকরা ৮৪ ভাগ মানুষই ছিল নিরক্ষর। ধর্ম, ভাষা, নৃতত্ত্ব এবং বর্ণের দিক দিয়া বহুভাগে বিভক্ত ছিল দেশটি। স্বাধীনতার পর প্রায় নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়া ভারত নিজের অন্তঃস্থ অনৈক্যকে ঐক্যসাধিত করিয়াছে। স্মর্তব্য যে, সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধীর দুই বত্সরের জরুরি অবস্থাকে ভারতবাসী প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। সুতরাং ভারতের ঐক্যের বিস্ময়কর সাঁকো হইল ‘গণতন্ত্র’। ইহাই ভারতীয় গণতন্ত্রের জাদুমন্ত্র।