মন্দা কাটাতে আইএমএফ কি সঠিক ভূমিকা রাখতে পারছে

শফিকুর রহমান রয়েল

 

মন্দা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই করোনা মহামারি ফের তীব্র অর্থনৈতিক সমস্যা ডেকে আনায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সামনে সুযোগ ছিল আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠার। সহজ কথায়, তারা বনে যেতে পারত পথের দিশারী। মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে তারা প্রচুরসংখ্যক ঋণ ব্যবস্থাপনার অনুমোদন দিলেও বস্তুত কার্যকর করেছে তার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সম্পদের ১০ শতাংশেরও কম। যদিও তহবিল বিবৃতি দিচ্ছে যে, ঋণ সক্ষমতা অনুসারে, আরো ‘যথেষ্ট সুযোগ’ রয়েছে ঋণ দেওয়ার। এমনকি তারা আরো অনেক ঋণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। সঙ্গত কারণেই তাই প্রশ্ন উঠছে, সমস্যাটা তাহলে কোথায়?

বিশ্ব অর্থনীতি গত বছর সংকুচিত হয়েছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। সে জায়গায় দেশগুলোর বহিঃঋণ প্রথম তিন প্রান্তিকেই বৃদ্ধি পেয়েছিল ৪ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই পরিস্থিতিতে আইএমএফ আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারত; কিন্তু যেটি তারা করেনি। ২০০৯ সালে বিশ্বের মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) কমেছিল  শূন্য দশমিক ১ শতাংশ; অথচ আইএমএফ কিন্তু তখন ঠিকই ছিল সক্রিয় ভূমিকায়। আইএমএফয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা গত এপ্রিলে জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণদান সক্ষমতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শুরুর সময়ের তুলনায় এখন চার গুণ বেশি। কিন্তু আইএমএফ তখন ব্যতিক্রমধর্মী সব উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসিত হয়েছিল। তখনকার নীতি ছিল আর্থিক সমস্যা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে ঋণ সক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা। আইএমএফ তখন কেবলই বিবৃতি দিত, ‘সমস্যার এই সময়ে বিশ্বস্ততার সহিত কাজ করার জন্য আমাদের আরো অনেক সম্পদ প্রয়োজন’। অর্থনৈতিক সমস্যা দূরীকরণে তখন তাদের যতটা আন্তরিক মনে হতো, এখন আর ততোটা মনে হয় না। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সমস্যা চলাকালীন সময়ের তুলনায় চলমান মহামারির এই সময়ে আইএমএফ অনেক কম ঋণ সহায়তার প্রস্তাব দিচ্ছে আর ঋণ প্রস্তাবের অঙ্কটাও থাকছে অনেক কম।

২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে এফসিএলসমূহ বাদ দিয়েই আইএমএফ ৭৫ বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতির অনুমোদন দিয়েছিল। ৩৪টি ঋণ ব্যবস্থাপনায় রাজি হয়েছিল, যেগুলোর গড় কোটার চেয়ে ৩৪০ শতাংশ বেশি বা ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফয়ের দ্বারস্থ হওয়ার আগে যে কোনো দেশ সাধারণত সমস্যা কাটিয়ে ওঠার বাকি সব প্রচেষ্টাই সম্পন্ন করে। বহু শর্তযুক্ত ঋণ এবং অপারগতায় বিধ্বংসী পদক্ষেপের মুখোমুখি সহজে কেউ হতে চায় না। ঋণ সংশ্লিষ্টতার ব্যয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিষয়াদিও জড়িত হয়ে যায়। ১৯৯০-র দশকে এশীয় অর্থনৈতিক সমস্যার সময় পূর্ব-এশীয় দেশগুলো আইএমএফয়ের কাছ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, তার ছিটেফোঁটাও ভোগ করতে হয় না ইউরোপীয় দেশগুলোকে। ইউরোজোন সমস্যা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারকেরাই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে প্রায় সব শর্তকেই নিয়ে যেত তাদের অনুকূলে। তারপরেও সেই পথে তারা হাঁটেনি। জি সেভেনের দেশ আইএমএফয়ের কাছ থেকে শেষ ঋণটি নিয়েছিল ইতালি, ১৯৭৭ সালে। সাধারণত তুলনামূলকভাবে ছোট অর্থনৈতিক আকৃতির দেশগুলোই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শরণাপন্ন হয়। করোনা মহামারিতে বৃহত্ অর্থনীতির দেশগুলো বেশি আক্রান্ত হওয়াতেই বোধহয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অতটা সরব নয়, আবার এমনটাও হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কোন দেশ ঋণ নিচ্ছে সেটি আইএমএফয়ের কাছে একটি বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু বিশ্বের প্রয়োজন হচ্ছে একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক আর্থিক নিরাপত্তা জাল, সেরকম হতে চাইলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে যন্ত্রসজ্জার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে এবং সংস্কার সাধন করতে হবে পরিচালনায়, যাতে করে এটি স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং সহযোগিতা চাওয়া দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সমর্থন যুগিয়ে যেতে পারে। রাজনৈতিক ব্যয় নিঃশেষ করে দিতে হবে। এখনকার মত চড়া মূল্য দিয়ে হলেও শেষ ভরসাস্থলের ভূমিকায় নাটকীয় পরিবর্তন ঘটাতে হবে, না হলে দরিদ্র দেশগুলোর কাছে কখনোই বন্ধু-প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারবে না। অথচ প্রতিষ্ঠার সময়ে মূল লক্ষ্য কিন্তু সেটিই ছিল। ফের ঐ স্থানে যেতে হলে মাঝেমধ্যেই তার প্রমাণ দিতে হবে নিরপেক্ষতার। নইলে বন্ধুর স্থলে আতঙ্ক হয়েই থাকবে অধিকাংশ দেশের কাছে।

আইএমএফ যে যথাযথ ভূমিকায় নেই, সেটি সম্ভবত এখন আন্দাজ করতে পারছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি তার দুরবস্থা কাটিয়ে উঠেছে বলে যে ধারণাটি ছিল তাদের, তা সম্ভবত এবার ভেঙেছে। ২০২১ ও ২০২২ সালে বিশ্বের প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে যথাক্রমে ৬ ও ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, তাদের এই প্রাক্কলন এরই মধ্যে তারা বাতিল করে দিয়েছে। অতিসম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সপ্তাহব্যাপী বস্তুকালীন ভার্চুয়াল মিটিং শেষ করে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে, ‘করোনার কারণে আরেকটি অর্থনৈতিক মহামন্দা নেমে আসতে পারে’। ক্রমবর্ধমান অসমতা তীব্র অনিশ্চয়তার কারণেই হয়তো এমনটি ঘটবে। দুরন্ত ভাইরাসটিকেই আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বের এক নম্বর সমস্যা বলে মনে হচ্ছে। এটি ভুল না সঠিক, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এ নিয়ে আতঙ্ক কাজ করছে বিশ্ব অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে।  —ফিন্যান্সিয়াল টাইমস অনুসরণে