দেশীয় বীজ সংরক্ষণ ও প্রকৃতিবান্ধব কৃষি

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন

হাওড়-বাঁওড়, নদী-নালা, খাল-বিলসহ প্রকৃতির অনুগ্রহে কৃষিতে অপার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। তবে উচ্চ ফলনশীল আর হাইব্রিড চাষাবাদে বিলুপ্ত হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির ধানসহ সবজি। এসব চাষাবাদ শুধু কৃষিব্যবস্থাই নয়, জীববৈচিত্র্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে। প্রকৃতি-পরিবেশ এবং মৃত্তিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশীয় প্রজাতির বীজ হারাতে বসেছে। বিজ্ঞানের আর্শীবাদে অধিক ফলনের আশায় হাইব্রিড চাষাবাদের নির্ভরশীলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বাংলার মাঠে ঘাটে স্বাদে গন্ধে ভরা প্রকৃতিবান্ধব অর্ধ শতাধিক দেশীয় প্রজাতির ধানবীজ বিলুপ্তির পথে। গ্রামবাংলার কৃষক সাধারণ দেশীয় প্রজাতির ধান চাষাবাদে উত্সাহী ছিলেন। খরা, বন্যা ও প্রকৃতি সহনশীল বিভিন্ন প্রজাতির ধান চাষাবাদের খরচও কম হতো। বর্তমানে এসব প্রজাতির ধান খুঁজে পাওয়া দায়।

হাইব্রিড বীজে চাষাবাদে সার, কীটনাশক ব্যবহার বেড়ে যায়। পোকার আক্রমণ বেশি বলে সার ও কীটনাশকের মাত্রাও বাড়িয়ে দিতে হয়। উচ্চ ফলনশীল (হাইব্রিড) চাষাবাদে তুলনামূলক বেশি ফলন হলেও চাষাবাদ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। উচ্চ ফলনশীল ধান অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রকৃতি-পরিবেশ এবং মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হাইব্রিড প্রজাতির বীজ কৃষক নিজে উত্পাদন ও সংরক্ষণ করতে পারেন না। সেই বীজ দিয়ে চাষাবাদ করার পর কৃষক নিজে বীজ রাখতে পারেন না। পরবর্তী মৌসুমে কৃষকদের আবার চড়া দামে কোম্পানির বীজ কিনতে হচ্ছে। পরের বছর জমিতে আরো বেশি সার ও কীটনাশক লাগছে। আবাদি জমিতে উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায় এবং আবাদের খরচ বছর বছর বাড়তেই থাকে। উত্পাদন খরচ বেশি হলেও বাজারদরে কৃষকরা দাম কম পান। কয়েক বছর ধারাবাহিক হাইব্রিড ধানের আবাদ করার পর কৃষকের ঘরে অবশিষ্ট বীজ না থাকলে কৃষকরা বীজের অধিকার হারান। পরবর্তী সময়ে বীজের জন্য পরনির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার জীববৈচিত্র্যকেও হুমকিতে ফেলেছে। হাইব্রিজ প্রজাতির চাষাবাদে পশুপাখির খাবার তৈরি হয় না। জমিতে সার-কীটনাশক প্রয়োগের পর সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে জলাশয়ে গিয়ে জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটায়।

বিপরীতে দেশি উন্নত জাতের চাষাবাদে পরিমাণমতো সার প্রয়োগ করে অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব। বিদেশি প্রজাতির উচ্চ ফলনশীল ধান চাষাবাদের চেয়ে প্রকৃতিবান্ধব দেশীয় প্রজাতির ধান চাষাবাদে রয়েছে অনুকূল পরিবেশ। সমতল ভূমি ছাড়াও উঁচু নিচু ঢালু জমি, বন্যার পানি অথবা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া জমিতেও চাষাবাদজনিত ধান রয়েছে। এরকম প্রজাতি রয়েছে কয়েক ফুট পানির ওপর ভেসে মাথা উঁচু করে অনায়াসেই থাকতে সক্ষম। মৌসুমের শুরুতে জমি তৈরি করে বীজ বপনের পর সার, কীটনাশক, সেচ ও নিড়ানির প্রয়োজন খুবই কম লাগে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় পোকামাকড়েরও আক্রমণ কম। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের তেমন প্রয়োজনীয়তা না থাকায় আবাদি জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায় না। অথচ হাইব্রিড বীজের কারণে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ নিঃশেষ হচ্ছে। উত্পাদন বেশি দেখাতে গিয়ে খরচ বাড়ানো হচ্ছে। জমির উর্বরতা নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল উচ্চ ফলনশীল ধান চাষের উপযুক্ত নয়। গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় সমস্ত বীজ ক্রমান্বয়ে উচ্চ ফলনশীল বীজে রূপান্তরিত করতে পারলে খাদ্য উত্পাদনের ঘাটতি মেটানো সম্ভব। আগামীতে খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলায় পারিপার্শ্বিক এসব পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যয়বহুল চাষাবাদের পরিবর্তে আমাদের প্রকৃতিবান্ধব দেশীয় উচ্চ ফলনশীল জাত ব্যবহারের বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, চাষিপর্যায়ে সরকারিভাবে বীজ উত্পাদন, সংরক্ষণ, বিতরণ ও জাত নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে উচ্চ ফলনশীল জাতের পাশাপাশি প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা ও ক্ষমতাসম্পন্ন বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির বীজের চাষাবাদ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিগুলোও রক্ষা হবে।

মৌলভীবাজার