বিপ্লব বিশ্বাস
আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রভাব বাঙালির জীবনধারাকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম অর্থাত্ দেশের সর্বত্রই প্রায় সব শ্রেণি, পেশা ও বয়সের নারী-পুরুষ, কিশোর ও তরুণদের হাতে ইন্টারনেটযুক্ত আধুনিক মোবাইলফোন এসে গেছে। আর এই মোবাইলফোনই এখন বেশিরভাগ মানুষের কাছে বিনোদনের প্রধান উত্স হিসেবে কাজ করছে। অনেকে আবার নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অবহেলা করেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারনেট জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া ছেড়ে মোবাইলফোনের প্রতিই বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেয়েও ইন্টারনেট জগত্ এখন অনেকের প্রিয় সাথি। পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য মোবাইলফোনে ব্যস্ত থাকায় পারিবারিক স্নেহ, মায়া, মমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ছে। পরিবারের সদস্যরা নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে এবং যথাসময়ে পালন করতে পারছেন না। অনেক পরিবারেই বাবা অথবা মা বা উভয়ই ব্যবসা বা চাকরির সঙ্গে জড়িত। তারাও বাড়িতে এসে সন্তানের খোঁজখবর না নিয়ে সেই মোবাইলফোন নিয়েই সময় কাটাচ্ছেন। অনেকক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর সুখের দাম্পত্য জীবনেও তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব ভাঙন ধরাচ্ছে।
আবহমান বাংলার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালির চিরাচরিত জীবনধারাকেও তথ্যপ্রযুক্তি ভীষণভাবে প্রভাবিত করছে। গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইলফোন ব্যবহার করায় অনেকেই ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছেন। এখন বেশিরভাগ মানুষই অনেক বেলায় ঘুম থেকে ওঠেন। ভোরের সূর্যোদয় দেখার সুযোগ বা অত্যন্ত উপকারী সকালের রোদ থেকে অনেকেই বঞ্চিত। সকালের রোদ মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টিতে অত্যন্ত সহায়ক। ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস আমাদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকালে ঘুম থেকে উঠলে দৈনন্দিন কাজকর্ম যথাসময়ে শুরু করা যায় এবং ঠিকভাবে সম্পন্নও করা যায়। কাজেই নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের মঙ্গলের জন্য পরিবার থেকেই তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধে সচেতন ও সতর্ক হতে হবে এবং একইসঙ্গে ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনকেই নয় বরং সমাজ ও রাষ্ট্রকেও নানাভাবে প্রভাবিত করছে। গুজব, অসত্য, বিভ্রান্তিকর এমনকি রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। অনেক সময় গুজব ছড়িয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। কাজেই তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গুজব, অসত্য ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজন সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা এবং তাঁদের দায়িত্ব হবে তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা। আশা করি সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ফরিদপুর