কৃষিজমি সুরক্ষা আইন কবে

কৃষিজমি সুরক্ষায় আইন করার লক্ষ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় একটি খসড়া প্রস্তুত করেছিল ২০১৯ সালে। তবে এটি এখনো আইনে পরিণত হয়নি। আইন না হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আবাদি কৃষিজমি বিনষ্ট করা হলেও এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আইনি জটিলতা দেখা দিচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কৃষিজমি সুরক্ষা আইন প্রণয়নে একাধিকবার তাগিদ দিলেও সেটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে যাওয়া একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জ ও আশুলিয়ায় বিভিন্ন আবাসন কোম্পানি ব্যাপক হারে কৃষিজমি বিনষ্ট করছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, কৃষিজমি সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ দুটি এলাকা কৃষিজমিশূন্য হয়ে পড়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে।

ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা-মাওয়া সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো কোম্পানি কৃষকদের কাছ থেকে কিছু জমি কিনে কয়েক গুণ জমি দখল করে ভরাট করছে। কখনো কখনো ভয় দেখিয়েও কৃষকদের জমি দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যেও ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রসঙ্গত, কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের খসড়ায় আইন অমান্য করলে অনূর্ধ্ব দুই বছর জেল এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা রয়েছে। কৃষিজমি সুরক্ষার পাশাপাশি ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে এ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আইনের খসড়ায় এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে পরিকল্পিত আবাসন, বাড়িঘর তৈরি, উন্নয়নমূলক কাজ এবং শিল্পকারখানা বা রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে প্রতিনিয়তই ভূমির প্রকৃতি ও শ্রেণিতে ব্যবহারের পরিবর্তন হইতেছে; দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমি, বনভূমি, টিলা, পাহাড় ও জলাশয়/শ্রেণিমহাল বিনষ্ট হইয়া খাদ্যশস্য উত্পাদন হুমকির মুখে পড়িতেছে এবং পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটিতেছে, ফলে অপরিকল্পিত বাড়িঘর, শিল্পকারখানা বা রাস্তাঘাট তৈরি রোধ করিয়া ভূমির শ্রেণী বা প্রকৃতি ধরিয়া রাখিয়া পরিবেশ ও খাদ্যশস্য উত্পাদন অব্যাহত রাখিবার উদ্দেশ্যে এবং কৃষিজমি ও কৃষি প্রযুক্তির প্রায়োগিক সুবিধার সুরক্ষাসহ ভূমির পরিকল্পিত ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়।’

কেরানীগঞ্জ ও আশুলিয়ায় কৃষিজমি শূন্য হওয়ার উপক্রমের বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রথম ধাপে কেরানীগঞ্জের ওপর একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মধু সিটি’ নামের আবাসন কোম্পানি স্থানীয় কৃষকদের কৃষিজমি, পৈতৃক সম্পত্তি, জলাশয় ভরাট করে মধু সিটি-১, ২, ৩ নামে প্রকল্প করছে। বালুরচর ও মধ্যেরচর মিলিয়ে বানানো হয়েছে মধু সিটি রিভারভিউ। এমনকি হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও জমির প্রকৃতি বদলে ফেলা হচ্ছে। এতে এলাকার ১০ শতাংশ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানালে উলটো মামলা-মোকদ্দমা হয়। মধু সিটির মালিক ছলিমউল্যাহ ও তার ভাই হাবিব উল্যাহর বিরুদ্ধে এ নিয়ে তদন্তও করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এদিকে, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জে প্রস্তাবিত স্যাটেলাইট শহর দ্রুত গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জে স্যাটেলাইট শহর স্থাপন নিয়ে উপস্থাপিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা জেলার তুরাগ নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যা প্রবাহ এলাকা সংরক্ষণ রেখে পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার জন্য ‘বন্যা প্রবাহ এলাকা, জলাশয় সংরক্ষণ ও কমপ্যাক্ট টাউনশিপ উন্নয়ন প্রকল্প এবং কেরানীগঞ্জে ‘ওয়াটারফ্রন্ট স্মার্ট সিটি’ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্প দুটির ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি ও পরিবেশগত স্ট্যাডির জন্য রাজউক ও চীনা রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) মধ্যে সমঝোতা স্মারকে সই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের আলোকে ঢাকা শহরের বন্যা প্রবাহ অঞ্চল সংরক্ষণ এবং এসজিডির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত মিরপুর, সাভার ও টঙ্গীর অন্তর্ভুক্ত ৯ হাজার ১১৬ দশমিক ৬৪ একর এলাকা নিয়ে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের উন্নয়ন এলাকা (আবাসিক, বাণিজ্যিক, নাগরিক পরিষেবা) ৩৮ শতাংশ এবং সংরক্ষিত এলাকা (জলাশয়, সবুজায়ন, বিনোদন ব্যবস্থা ও খাল/নদীর বাঁধ নির্মাণ) হিসেবে ৬২ শতাংশ ভূমি ব্যবহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির মতে, আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জে প্রস্তাবিত স্যাটেলাইট শহর গড়ে ওঠার আগেই কৃষিজমি সুরক্ষা আইন প্রণয়ন জরুরি। অন্যথায় সমন্বয়ের অভাবে কৃষিজমি নষ্ট হতে পারে।