নাগরিক সাংবাদিকতা আধুনিক সাংবাদিকতারই প্রতিফলন। সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতার রূপ পরিবর্তিত হচ্ছে। নাগরিক সাংবাদিকতার কল্যাণে আজ বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নাগরিক সাংবাদিকতার ধারণা হলো- স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বপ্রণোদিত হয়ে গণমানুষের খবর, তথ্য সংগ্রহ, পরিবেশন, বিশ্লেষণ ও প্রচারে অংশগ্রহণ করাই হলো নাগরিক সাংবাদিকতা। নাগরিক সাংবাদিকতায় কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও স্বীকৃতি ছাড়াই সাধারণ নাগরিকরা অনলাইন প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান করে থাকে।
আশপাশে ঘটে চলা ঘটনাগুলো নাগরিকরা যখন তাদের ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, গুগলসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শেয়ার করে তখন তাকে নাগরিক সাংবাদিকতা বলে। ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার মোবাইল ফোন হলো নাগরিক সাংবাদিকতার অন্যতম কয়েকটি মাধ্যম। সহজলভ্য ইন্টারনেট আর বাহারি তথ্যের সমাহার সাংবাদিকতায় নতুনত্বের ছোঁয়া এনে দিয়েছে।
নাগরিক সাংবাদিকতা বর্তমান প্রজন্মে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। অল্প সময়ের মধ্যে তথ্যে জানতে পারা যায় বিধায় পাঠকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে নাগরিক সাংবাদিকতার প্রতি। নাগরিক সাংবাদিকতায় নাগরিকরা এক দিকে যেমন সংবাদ লেখক সেই সঙ্গে পাঠকও বটে।
নাগরিক সাংবাদিকতায় রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক একেক জন সাংবাদিক। বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রামে নাগরিক সাংবাদিকতাকে করেছে আরো সমৃদ্ধ। বর্তমান সময়ে এতো এতো ঘটনার সৃষ্টি হয় যে, যা নাগরিকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে সবাইকে জানানোর ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। নাগরিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য, ছবি, ভিডিও সংগ্রহ করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন ।
একটা সময় সাংবাদিকতা বলতে শুধু পেশাদারি সাংবাদিকতা বা মূলধারার সাংবাদিকতাকেই বোঝাত। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো বলতে রেডিও, টেলিভিশন ও খবরের কাগজকেই বোঝানো হতো। পাঠককে একটি খবরের জন্য পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। কারণ মূলধারার সাংবাদিকতায় নিয়োজিত সংবাদকর্মীরা সারা দিন সংবাদ সংগ্রহ করে তা রাতে ছাপাতেন। পাঠক মাত্রই নতুন নতুন তথ্য শুনতে আগ্রহী। প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনা ঘটে, অসংখ্য তথ্যের সৃষ্টি হয় অথচ সব ঘটনা সব তথ্য পত্রিকায় প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো পাঠকদের তথ্যের চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খেত। মানুষের কর্মব্যস্ত জীবনে সবসময় টেলিভিশন বা পত্রিকার সামনে বসে থেকে খবর দেখা বা শোনা সম্ভব নয়। যে কারণে পাঠকের মধ্যে সংবাদ শোনা বা পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ।
বর্তমান সময়ে অনলাইন সুবিধার ফলে প্রতিটি পাঠক মুহূর্তের মধ্যে ফেইসবুক, টুইটার ব্যবহার করে নতুন নতুন তথ্য জানতে পারে, জানাতে পারে, শুনতে পারে। যা অনেক বড় একটি অবদান সাংবাদিকতায়।
নাগরিক সাংবাদিকতা জনপ্রিয় হলেও প্রকৃত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারে মূলধারার গণমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নাগরিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে শুধু ঘটনার শুরু দেখতে পাই। ঘটনাটি কেন ঘটল, কীভাবে ঘটল, ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য আমাদের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। মূলধারার সাংবাদিকতায় আমরা অনুসন্ধানীমূলক তথ্য জানতে পারি অথচ নাগরিক সাংবাদিকতায় আমরা শুধু ঘটনার সম্মুখভাগ জানতে পারি।
নাগরিক সাংবাদিকতায় প্রতিটি ঘটনা প্রকাশের পর তার গুরুত্ব শেষ হয়ে যায় অর্থাত্ আবার নতুন একটি ঘটনার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তবে মূলধারার সাংবাদিকতায় সংবাদকর্মীরা একটি নির্দিষ্ট চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে। মূলধারার সাংবাদিকতা মানুষকে গভীরভাবে ভাবতে সাহায্য করে অথচ নাগরিক সাংবাদিকতায় একটি ঘটনার শুরুটা দেখিয়েই সীমাবদ্ধ থাকে।
সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমকে বলা হয়ে থাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাধীনভাবে তথ্য প্রকাশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অন্যান্য সবকিছুর মতো গণমাধ্যম, সংবাদমাধ্যমগুলোও পরিবর্তিত হচ্ছে। নাগরিক সাংবাদিকতা তারই প্রতিফলন। নাগরিক সাংবাদিকতা মূলধারার সাংবাদিকতার বিকল্প নয় বরং সহায়ক। নাগরিক সাংবাদিকতা মূলধারার সাংবাদিকতার প্রাথমিক প্রতিচ্ছবি ।
তথ্যপ্রযুক্তির এই অপার সম্ভাবনাময় এই যুগে সাংবাদিকতা বিষয়ে যে আধুনিক ছোঁয়া লেগেছে, সেই আধুনিক ছোঁয়ার সদ্ব্যবহার একান্তই কাম্য। নাগরিক সাংবাদিকতা আমাদের জন্য যে অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে তার সঠিক ব্যবহারই সমাজের মূল্যবোধ বিকশিত করতে পারে। নাগরিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে আমাদের সবসময় বস্তুনিষ্ঠ ও সত্য সংবাদ প্রকাশ করাই যথাযুক্ত। আধুনিক সাংবাদিকতাকে সরল পথে ধাবিত করতে এবং আধুনিক নাগরিক সাংবাদিকতাকে আরো সমৃদ্ধ করতে নাগরিকদের সচেতনতার সঙ্গে সঠিক তথ্যগুলোই প্রকাশ করা উচিত ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়