করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবসাবান্ধব বাজেট দাবি

ইত্তেফাক রিপোর্ট

দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং নতুন করে লকডাউন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির বিষয়টি মাথায় রেখে আগামী বাজেট প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। এই কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা বিশেষত উত্পাদন ও ভোগব্যয়ে গুরুত্ব দেওয়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা থেকে ঝরে পড়ার হাত থেকে রক্ষার লক্ষ্যে কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া এবং এ লক্ষ্যে ভ্যাট, ট্যাক্স যৌক্তিক হারে কমানোসহ ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। গতকাল শনিবার এক প্রাক বাজেট আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা : অর্থবছর ২০২১-২২’ শীর্ষক ঐ আলোচনা সভার আয়োজন করে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), দৈনিক সমকাল এবং চ্যানেল টোয়েন্টিফোর। এতে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমানের সঞ্চালনায় এতে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, অর্থনীতিবিদ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতিনিধি ছাড়াও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের মতামত তুলে ধরেন।

ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমান আয়কর ও ভ্যাট, আর্থিক খাত, শিল্প ও বাণিজ্য এবং জ্বালানি, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতকে বাজেটে গুরুত্ব প্রদান করা প্রয়োজন বলে মত।

আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনার প্রথম ধাক্কার পর অর্থনীতি কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও নতুন করে অনিশ্চয়তা পড়ে গেল। এখন নতুন করে হয়তো গতি মন্থরতা শুরু হবে। এ পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরক্ষা দরকার। তিনি বলেন, এক সময়ের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি এখন স্থানীয় শিল্পনির্ভর হয়ে উঠছে। এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন প্রক্রিয়া এখনো সহজ নয়।

এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাসুদুর রহমান বলেন, এসএমই খাত এখনো নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এ খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার অর্থ পাঁচ দফা সময় বাড়ানোর পরও বিলি সম্পন্ন হয়নি। এখন পর্যন্ত অর্থছাড় হয়েছে ৬৮ শতাংশ। অথচ রপ্তানির জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ৯৮ শতাংশ ছাড় হয়েছে। 

বিল্ড-এর চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান বলেন, আমরা বর্তমানে মহাসংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, এ অবস্থায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে চাহিদা ধরে রাখা প্রয়োজন।

দৈনিক সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সংবাদপত্র মারাত্মক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সংবাদপত্র শিল্প প্রায় ৩৭ শতাংশ কর দিয়ে থাকে। তিনি নিউজপেপার আমদানি শুল্ক শূন্য হারে নামিয়ে আনার আহ্বান জানান।

ড. মসিউর রহমান বলেন, ব্যবসা বাণিজ্য তথা অর্থনীতির প্রসার না হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে না। শুল্ককর গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে না থাকলে ব্যবসা সম্প্রসারণ হয় না। অন্যদিকে সরকারের ব্যয়ের জন্যও রাজস্ব প্রয়োজন। তবে এই ব্যয় কোন খাতে হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাচ্ছে কি না, মানুষ তাও জানতে চায়। তিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত না করে কী হারে রাজস্ব বাড়ানো যায়, সরকারকে তার একটি দিক-নির্দেশনা প্রদানের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ৭-১০ বছরের জন্য একটি টেকসই ও সহনশীল কর কাঠামো দেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া করের হার গ্রহণযোগ্য হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নাগরিকদের ওপর আরোপিত কর সেই নাগরিকের কাছে গ্রহণযোগ্য কি না, সে বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ঘন ঘন করের হার বাড়ানো-কমানো ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় আইপিডিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে বন্ড মার্কেট উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য ব্যাংকের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে। এ সময় এনবিআরের কর্মকর্তারা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারের রাজস্ব আদায় সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাবের কথাও জানান।

এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন, হিসাববিদ আদিব এইচ খান, এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক নীতি বিভাগের তিন সদস্য, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম প্রমুখ।